মো. আহসানুল হক খন্দকার : হিমালয়ের পর্বতারোহণের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার স্বীকৃত পর্বতশৃঙ্গের সংখ্যা বর্তমানে ১৪টি। তবে নেপাল সরকার ও নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন (এনএমএ) আরও ছয়টি শৃঙ্গকে স্বতন্ত্র ৮-থাউজান্ডার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্লাইম্বিং অ্যান্ড মাউন্টেনিয়ারিং ফেডারেশন (ইউআইএএ) প্রস্তাবটি অনুমোদন করলে বিশ্বের ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বতশৃঙ্গের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ২০টিতে।
প্রস্তাবিত ছয়টি শৃঙ্গের মধ্যে চারটি কাঞ্চনজঙ্ঘা ম্যাসিফে এবং দুটি এভারেস্ট-লোৎসে অঞ্চলে অবস্থিত। কাঞ্চনজঙ্ঘা ম্যাসিফের শৃঙ্গগুলো হলো—ইয়ালুং কাং (৮,৫০৫ মিটার), কাঞ্চনজঙ্ঘা সেন্ট্রাল (৮,৪৭৩ মিটার), কাঞ্চনজঙ্ঘা সাউথ (৮,৪৭৬ মিটার) এবং ইয়ালুং কাং ওয়েস্ট (৮,০৭৭ মিটার)। অন্যদিকে এভারেস্ট-লোৎসে অঞ্চলের প্রস্তাবিত শৃঙ্গ দুটি হলো—লোৎসে মিডল (৮,৪১০ মিটার) ও লোৎসে সার (৮,৪০০ মিটার)।
কেন নতুন করে স্বীকৃতির দাবি?
পর্বতারোহণে কোনো শৃঙ্গকে স্বতন্ত্র পর্বত হিসেবে বিবেচনার ক্ষেত্রে উচ্চতার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘টপোগ্রাফিক প্রমিনেন্স’। অর্থাৎ মূল পর্বত বা আশপাশের উচ্চভূমি থেকে একটি শৃঙ্গ কতটা স্বতন্ত্রভাবে উঁচু হয়ে উঠেছে, তা নির্ধারণে এই মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে লোৎসে মিডলের কথা বলা যায়। ৮ হাজার ৪১০ মিটার উচ্চতার এই শৃঙ্গটি মূল লোৎসে পর্বতের রিজের অংশ হওয়ায় এতদিন স্বতন্ত্র পর্বত হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। অথচ এর উচ্চতা বিশ্বের পঞ্চম উচ্চতম পর্বত মাকালুর (৮,৪৬৩ মিটার) কাছাকাছি।
নেপালের প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি হলো, নতুন করে স্বীকৃতির জন্য বিবেচিত ছয়টি শৃঙ্গের প্রতিটির রয়েছে স্বতন্ত্র সামিট পয়েন্ট এবং আলাদা, কারিগরিভাবে কঠিন আরোহণপথ। তাই এগুলোকে কেবল মূল পর্বতের উপশৃঙ্গ হিসেবে না দেখে স্বতন্ত্র পর্বত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।
নেপালের পর্বত-অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে
বর্তমানে স্বীকৃত ১৪টি আট-হাজারি পর্বতের মধ্যে আটটি নেপালে অবস্থিত। প্রস্তাবিত ছয়টি শৃঙ্গ স্বীকৃতি পেলে নেপালের তালিকায় এ ধরনের পর্বতের সংখ্যা বেড়ে হবে ১৪টি। অর্থাৎ সম্ভাব্য ২০টি আট-হাজারি পর্বতের ৭০ শতাংশই থাকবে নেপালে।
পর্বতারোহণে কী পরিবর্তন আসতে পারে?
প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে বিশ্বজুড়ে পর্বতারোহীদের প্রচলিত লক্ষ্যেও পরিবর্তন আসতে পারে। এতদিন যাঁরা ১৪টি আট-হাজারি শৃঙ্গ জয়ের লক্ষ্য নিয়ে অভিযান চালিয়েছেন, তাঁদের সামনে তখন নতুন করে ছয়টি শৃঙ্গ যুক্ত হবে। ফলে ১৪টি পর্বত জয়ের প্রচলিত লক্ষ্য বেড়ে ২০টিতে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষ করে লোৎসে মিডল ও ইয়ালুং কাংয়ের মতো কারিগরিভাবে কঠিন শৃঙ্গগুলো অভিজ্ঞ পর্বতারোহীদের কাছে নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। তবে এসব শৃঙ্গের স্বীকৃতি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে ইউআইএএর মূল্যায়ন ও অনুমোদনের ওপর।
নেপালের এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে শুধু আট-হাজারি পর্বতের প্রচলিত তালিকাই বদলাবে না, উচ্চতাভিত্তিক পর্বতারোহণের ইতিহাসেও যুক্ত হবে নতুন অধ্যায়। এখন অপেক্ষা আন্তর্জাতিক সংস্থাটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের।