গুদামে সার, মাঠে হাহাকার—উত্তরে কৃষকের ক্ষোভ কেন?

গুদামে সার, মাঠে হাহাকার—উত্তরে কৃষকের ক্ষোভ কেন?

বিশেষ প্রতিনিধি : সরকার বলছে দেশে সারের মজুত পর্যাপ্ত, সংকট নেই। কিন্তু মাঠের চিত্র ভিন্ন—সারের জন্য গুদাম ভাঙচুর, লুট, সড়ক অবরোধ ও ডিলার ঘেরাওয়ের ঘটনা ছড়িয়ে পড়ছে উত্তরাঞ্চলের একাধিক জেলায়। আমন মৌসুমে তৈরি হওয়া এই সংকট দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে এর প্রভাব পড়তে পারে আসন্ন বোরো ধান, শীতকালীন সবজি, খাদ্যপণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতিতে।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা গুদামের সামনে অপেক্ষা। শত শত কৃষকের ভিড়। কিন্তু মিলছে না সার, খুলছে না ডিলারের গুদামের দরজাও। একপর্যায়ে অপেক্ষা ও ক্ষোভের বাঁধ ভেঙে যায়। গুদামের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েন কৃষকেরা। বের করে নিয়ে যান ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া, যার পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার ৮৫০ কেজি।

ঘটনাটি ঘটে গত ২৩ আগস্ট কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নে।

তবে এটি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ভূরুঙ্গামারীর পর উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সারের জন্য কৃষকদের বিক্ষোভ, গুদাম ভাঙচুর, সড়ক অবরোধ ও ডিলার ঘেরাওয়ের ঘটনা সামনে এসেছে। কোথাও নির্ধারিত সময়ে সার না পাওয়ার অভিযোগ, কোথাও গুদাম থেকে সার না দেওয়ার অভিযোগ, আবার কোথাও সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। তাহলে প্রশ্ন উঠছে—সরকারি গুদামে সার থাকার পরও কৃষকের হাতে তা সময়মতো পৌঁছাচ্ছে না কেন?

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, আমন মৌসুমের এই সমস্যা দ্রুত সমাধান করা না গেলে এর প্রভাব আরও বড় হয়ে দেখা দিতে পারে বোরো মৌসুমে। একই সঙ্গে শীতকালীন সবজি উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। আর উৎপাদন ব্যাহত হলে শেষ পর্যন্ত চাপ তৈরি হতে পারে খাদ্যপণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতিতে।

একের পর এক এলাকায় ছড়াচ্ছে ক্ষোভ

ভূরুঙ্গামারীর ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসনের তদন্তে সংশ্লিষ্ট ডিলারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগও উঠে আসে। তদন্ত কমিটি সার বিতরণে বিলম্ব এবং বিক্রির হিসাবের অসঙ্গতি পাওয়ার কথা জানায়। পরে ওই ডিলারের ডিলারশিপ বাতিলের সুপারিশ করা হয়।

কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

৬ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর কচাকাটা বাজারে সার দিতে দেরি হওয়াকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে কৃষকেরা ডিলারের গুদামের টিনের বেড়া ভাঙচুর করেন। তবে সেখানে সার লুটের ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

একই দিন ভূরুঙ্গামারীতেও সার না পাওয়ার অভিযোগে সড়ক অবরোধ করেন কৃষকেরা।

কুড়িগ্রামের বাইরে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে লালমনিরহাটেও। সেখানে কৃষকেরা মহাসড়ক অবরোধ করে অভিযোগ করেন, সময়মতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কোথাও সার পাওয়া গেলেও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে।

পরদিন ৭ সেপ্টেম্বর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

কুড়িগ্রামের রৌমারীতে ডিলারের গুদামে হামলা, ভাঙচুর এবং সার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। একই দিনে লালমনিরহাটেও সড়ক অবরোধ করেন কৃষকেরা।

রাজশাহীর পুঠিয়াতেও প্রায় ৩০০ কৃষক ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন। তাদের অভিযোগ, ডিলারের কাছে নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ খুচরা বাজারে একই সার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

অর্থাৎ, ভূরুঙ্গামারীর গুদাম ভাঙার ঘটনা আর একক কোনো ঘটনা নয়।

উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গা থেকে এখন একই ধরনের অভিযোগ আসছে—সময়মতো সার মিলছে না, কোথাও গুদাম বন্ধ, কোথাও সরবরাহ সীমিত, কোথাও বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও ডিলারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠছে।

কৃষকের ক্ষোভ তাই গুদামের সামনে থেকে এখন সড়কে ছড়িয়ে পড়ছে।

সার আছে, কিন্তু কৃষকের হাতে নেই

সারের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই।

সরকার বলছে দেশে সার রয়েছে। অথচ মাঠপর্যায়ে কৃষকের অভিযোগ—প্রয়োজনের সময়ে তারা সেই সার পাচ্ছেন না।

২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ টন সার মজুত রয়েছে। এর বাইরে আরও ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮০০ টন সার পাইপলাইনে রয়েছে। গত বছরের একই সময়ে মজুত ছিল প্রায় ১২ লাখ টন।

অর্থাৎ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার সারের মজুত বরং বেশি।

কৃষিমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। তার ভাষায়, “আমি সরকারের বুলি আওড়াচ্ছি না, সত্যিটাই বলছি।”

মন্ত্রী জানান, রংপুরে গত বছরের আগস্টে ১০ হাজার ৫৯০ টন সার সরবরাহ করা হয়েছিল। এবার একই সময়ে সরবরাহ করা হয়েছে ১৮ হাজার ৮৪৭ টন।

তবে সরকারি হিসাবে মজুত বাড়ার পরও যদি কৃষককে সার না পেয়ে গুদাম ভাঙতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠছে সরবরাহ ব্যবস্থার কোথায় সমস্যা তৈরি হয়েছে।

কেন কৃষককে সড়ক অবরোধ করতে হচ্ছে?

কেন সরকারি ডিলারের কাছে সার না পেয়ে খোলা বাজারে যেতে হচ্ছে?

আর কেনই বা সেখানে নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে?

সরকারের পক্ষ থেকে এর একটি ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, একটি সংঘবদ্ধ চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় বিশেষ টাস্কফোর্স ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথাও জানিয়েছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমানও বলেছেন, কোথাও কোথাও সার বিতরণে সমস্যা হচ্ছে এবং তা সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তবে মাঠের বাস্তবতা নিয়ে কৃষকদের অভিযোগ ভিন্ন।

বিডিনিউজ২৪-এর প্রতিবেদনে বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা জানিয়েছেন, সরকারি ডিলারের কাছে সার না পেয়ে তাদের খোলা বাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সেখানে ৫০ কেজির ডিএপি সারের সরকারি দাম ১ হাজার ৫০ টাকা হলেও কোথাও ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা।

দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে ডিলার পয়েন্টে সার না পাওয়া এবং রেশনিংয়ের অভিযোগও উঠে এসেছে। কোথাও কোথাও খোলা বাজারে ৫০ কেজির বস্তায় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু ‘দেশে সার আছে কি নেই’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। বড় প্রশ্ন হচ্ছে, মজুত থাকা সার সময়মতো, সঠিক দামে এবং সঠিক কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে কি না।

দায় কি শুধু ডিলারদের?

সরকারের বক্তব্য যদি হয় দেশে পর্যাপ্ত সার রয়েছে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—মজুত থাকা সার মাঠপর্যায়ে যাচ্ছে না কেন?

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান অবশ্য বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি সংকট হিসেবেই দেখছেন। তার মতে, এর পেছনে শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নয়, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও ভূমিকা রাখছে।

আলাপকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, সার আমদানিতে সমস্যা এবং দেশে সার উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট তৈরি হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে, আর সেখান থেকেই বিক্ষোভ, ঘেরাও ও সার নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে।

তার মতে, ডিলার পর্যায়েও সমস্যা রয়েছে। সরকারকে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার কোথায় সমস্যা হচ্ছে তা খুঁজে বের করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

কারণ একজন ডিলারের অধীনে সাধারণত তিনজন সাব-ডিলার কাজ করেন। ডিলার থেকে সাব-ডিলার হয়ে কৃষকের হাতে সার পৌঁছানোর পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করে কোথায় অনিয়ম হচ্ছে, তা চিহ্নিত করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

একই সঙ্গে সরবরাহ বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছেন এই কৃষি অর্থনীতিবিদ।

সারের সংকটের শেকড় কোথায়?

বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৬৬ লাখ টন রাসায়নিক সার প্রয়োজন হয়। এর বড় একটি অংশ ব্যবহার হয় ধান উৎপাদনে।

দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত সাতটি সার কারখানার সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা বছরে ৩৭ লাখ টনের বেশি। কিন্তু বাস্তবে সেই সক্ষমতার বড় অংশই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা মিলে উৎপাদন করেছে মাত্র ১১ লাখ ৬ হাজার টন সার।

ফলে দেশের চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সার আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হচ্ছে।

এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের নির্ভরতা—দেশে উৎপাদন কমছে, আর আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

গ্যাস সংকটে বন্ধ সার কারখানা

দেশে সার উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ গ্যাস সংকট।

বিশেষ করে ইউরিয়া উৎপাদনে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন। কিন্তু গ্যাসের অভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলোর বড় অংশ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকছে।

জুলাইয়ের হিসাবে সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার মধ্যে মাত্র দুটি চালু ছিল।

২৫ জুলাই বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) পরিচালক (বাণিজ্য, উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছিলেন, বিসিআইসির গ্যাসভিত্তিক সার কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে তার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ।

তিনি জানান, গত অর্থবছরে দেশে ১১ লাখ ৬ হাজার টন সার উৎপাদন হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ পাওয়া গেলে আরও ২২ থেকে ২৫ লাখ টন সার উৎপাদন করা সম্ভব ছিল।

অর্থাৎ দেশে কারখানা আছে, উৎপাদন সক্ষমতাও রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় গ্যাস না থাকায় সেই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম খানও মনে করেন, গ্যাস সংকটের কারণে দেশীয় উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে।

তার মতে, ইউরিয়া উৎপাদনে দেশের সক্ষমতা প্রায় ৩২ লাখ টন হলেও বর্তমানে তা প্রায় ১০ লাখ টনে নেমে এসেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরোনো কারখানাগুলোর সক্ষমতা ও রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা। সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার মধ্যে শাহজালাল সার কারখানা এবং ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা তুলনামূলক নতুন। বাকি পাঁচটি কারখানা ১৯৬৫ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে স্থাপিত।

ফলে পুরোনো যন্ত্রপাতি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও সার উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে।

উৎপাদন কমছে, বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা

বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৬৬ লাখ টন সার প্রয়োজন হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত সাতটি কারখানায় উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৬ হাজার টন।

ঘাটতি পূরণে তাই প্রতি বছর ৪০ লাখ টনের বেশি সার আমদানি করতে হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও দেশে প্রায় ৪৪ লাখ ৭৮ হাজার টন সার আমদানি করা হয়েছিল।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খানের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় উৎপাদনের বদলে আমদানির ওপর বাড়তে থাকা নির্ভরতাও বর্তমান পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

তার প্রশ্ন, যে প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের সার উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত, তাদের দিয়েই আমদানির পাশাপাশি উৎপাদন বাড়ানোর দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করানো হচ্ছে কি না।

কারণ দেশের উৎপাদন কমে গেলে ঘাটতি পূরণে আমদানিই হয়ে ওঠে প্রধান ভরসা। আর আমদানিনির্ভরতা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট কিংবা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় যেকোনো অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি দেশের কৃষি খাতে পড়তে পারে।

অর্থাৎ, একদিকে দেশে সার কারখানা ও উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও গ্যাস ও অন্যান্য সমস্যায় উৎপাদন কমছে; অন্যদিকে ঘাটতি পূরণে বাড়ছে এমন একটি আমদানিনির্ভরতা, যার ওপর বাংলাদেশের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই।

সংকটের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে শঙ্কা

পুরো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে সারের সমস্যাটি অন্তত তিনটি স্তরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রথমত, দেশীয় উৎপাদন সংকট।

দ্বিতীয়ত, আমদানিনির্ভরতা ও সরবরাহের ঝুঁকি।

তৃতীয়ত, মাঠপর্যায়ে বিতরণ ব্যবস্থার সংকট।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কৃষকের আতঙ্ক।

ভূরুঙ্গামারী থেকে কুড়িগ্রামের অন্যান্য এলাকা, লালমনিরহাট থেকে রাজশাহী—সারের জন্য কৃষকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, কাগজে-কলমে মজুত থাকলেই মাঠপর্যায়ের সংকট সমাধান হয় না।

কৃষকের প্রয়োজনের সময়, প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার সঠিক দামে হাতে পৌঁছানোই আসল বিষয়।

তাই সারের বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু ‘কৃত্রিম সংকট’ বলে দেখলে সমস্যার গভীরে যাওয়া হবে না। একইভাবে শুধু ডিলারদের অনিয়মের দিকে তাকিয়েও পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।

দেশীয় উৎপাদন, গ্যাস সরবরাহ, আমদানি, মজুত এবং ডিলার-সাবডিলার হয়ে কৃষকের হাতে সার পৌঁছানো—পুরো ব্যবস্থাটিকে একসঙ্গে দেখতে হবে।

কারণ আমন মৌসুমে তৈরি হওয়া এই সংকট যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আসে এবং তা বোরো মৌসুম পর্যন্ত গড়ায়, তাহলে এর প্রভাব শুধু কৃষকের জমিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

এর ধাক্কা পৌঁছাতে পারে বোরো ধানের উৎপাদনে, শীতকালীন সবজির বাজারে, চালের দামে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের খাদ্য ব্যয়ে।

তখন সারের সংকট আর শুধু কৃষকের সমস্যা থাকবে না—তা হয়ে উঠতে পারে খাদ্যনিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির বড় উদ্বেগ।
MM/AAM