বিশেষ প্রতিনিধি: জীবদ্দশায় সন্তানদের নামে সম্পত্তি দান বা হস্তান্তর করলেও বাবা-মা যাতে আমৃত্যু সেই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি হয়েছে সংশোধিত সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে। নতুন বিধানকে বাবা-মায়ের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন কয়েকজন আইনজীবী। তবে সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, নতুন বিধান ইসলামি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এর ফলে প্রকৃত উত্তরাধিকারীদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সংসদে স্পষ্ট করেছেন, সংশোধিত আইনে মুসলিমদের হেবা বা মুসলিম আইনের কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাবা-মায়ের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতেই এই সংশোধনী আনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
ধরা যাক, আবদুল ওয়াদুদ অবসরে গিয়ে জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে একটি বাড়ি তৈরি করলেন। জীবিত থাকতেই তিনি বাড়িটি সন্তানদের নামে লিখে দিতে চান। তবে শর্ত রাখতে চান—তিনি যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন বাড়িটিতে বসবাস ও ভোগদখলের অধিকার তার থাকবে।
আগের আইনে এ ধরনের শর্ত যুক্ত করার সুযোগ নিয়ে জটিলতা থাকলেও নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে বাবা-মায়ের মতো দাতাদের আজীবন ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
রবিবার ১৮৮২ সালের ‘দ্য ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল’ সংসদে পাস হয়। সংশোধনীতে নতুন করে ১২২এ ও ১২২বি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে সম্পত্তি দান বা হস্তান্তরের পরও দাতার জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার বহাল রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তবে নতুন বিধান নিয়ে সংসদে বিতর্কও হয়েছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এটিকে কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবি করে বিলের বিরোধিতা করা হয়।
ইসলামি আইনের সঙ্গে কতটা সাংঘর্ষিক?
নতুন সংশোধনীর আগে সম্পত্তি দান বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ নিয়ে সীমাবদ্ধতা ছিল। সংশোধিত আইনে বাবা-মা চাইলে সন্তানদের নামে সম্পত্তি দেওয়ার সময় নিজেদের জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিতি সানজানা মনে করেন, নতুন বিধান বাবা-মায়ের সম্পত্তিগত নিরাপত্তা বাড়াবে। তার মতে, আগে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর বাবা-মায়ের নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত। নতুন আইনে সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমবে।
তার ভাষ্য, অনেক বাবা-মা সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি সমানভাবে ভাগ করে দিতে চান। কিন্তু পরবর্তীতে কোনো সন্তান যদি বাবা-মায়ের দায়িত্ব না নেন, তাহলে তারা অসহায় হয়ে পড়তে পারেন। নতুন আইনে সম্পত্তির ভোগদখল নিজেদের হাতে রাখার সুযোগ থাকায় এ ধরনের ঝুঁকি কমবে।
মিতি সানজানার মতে, বাবা-মায়ের কল্যাণের জন্য এই বিধান ইসলামি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার কথা নয়।
অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসানও মনে করেন, সংশোধিত আইনটি ইসলামি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। তার মতে, মুসলিম আইন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর আইন—দুটি পৃথক আইনি কাঠামো। কেউ চাইলে প্রচলিত মুসলিম আইনের অধীনে সম্পত্তি হেবা করতে পারবেন, আবার নতুন আইনের সুযোগও নিতে পারবেন।
তিনি বলেন, ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে সংশোধিত আইনকে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখার আগে বিষয়টির আইনি কাঠামো আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী ড. কাজী জাহেদ ইকবালও সংশোধনীতে ইসলামি আইনের সঙ্গে সরাসরি কোনো সংঘাত দেখছেন না। তবে তিনি মনে করেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যদি কোনো অস্পষ্টতা বা সাংঘর্ষিক বিষয় তুলে ধরা হয়, তাহলে সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আলোচনার মাধ্যমে তা পরিষ্কার করা যেতে পারে।
হেবা, মিরাস ও ওসিয়ত—তিনটি কি একই বিষয়?
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. বাহাউদ্দিন আল ইমরানের মতে, ইসলামি আইনে মিরাস, হেবা ও ওসিয়ত পৃথক বিষয়।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জীবিত অবস্থায় কাউকে সম্পত্তি দিয়ে দেওয়া এবং মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টন—দুটি ভিন্ন বিষয়। জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি বৈধভাবে হস্তান্তর হয়ে গেলে সেটি সাধারণভাবে মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সম্পত্তির অংশ হিসেবে বণ্টনের বিষয় থাকে না।
তবে সম্পত্তি হস্তান্তরের সময় মালিকানা এবং ভোগদখলের অধিকার কার কাছে থাকবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
এ কারণে সংশোধিত ১২২এ ও ১২২বি ধারা প্রচলিত হেবা-নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সে বিষয়ে আলেম ও ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞদের সুস্পষ্ট মতামত প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, সংশোধনকে সরাসরি ‘শরিয়াবিরোধী’ বলা যেমন সরলীকরণ হবে, তেমনি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো প্রশ্নই নেই—এমন দাবিও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সংসদে কী নিয়ে বিতর্ক হয়েছে?
সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বিলটির উদ্দেশ্যকে মানবিক ও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করলেও সংশোধনীর মাধ্যমে বিভ্রান্তি ও আইনি জটিলতা তৈরির আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তিনি কোরআনের সূরা নিসার ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ইসলামি উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় সম্পত্তি বণ্টনের নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। তার দাবি, নতুন বিধানের কিছু বিষয় সেই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ইসলামি আইনে কাউকে সম্পত্তি দেওয়ার পর তার মালিকানা ও ভোগের অধিকার কীভাবে কার্যকর হবে, তা স্পষ্ট। তাই সংশোধনী কার্যকর করার আগে শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বিষয়টি আরও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বিরোধীদলীয় নেতা আশঙ্কা করেন, নতুন আইনের সুযোগ নিয়ে প্রকৃত হকদারদের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমানও বিলটির বিরোধিতা করে বলেন, বাবা-মাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার সামাজিক সমস্যা বাস্তব হলেও এর সমাধান করতে গিয়ে ইসলামি বিধান পাশ কাটানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্য
বিরোধী দলের অভিযোগের জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সংসদে বলেন, সংশোধিত আইন হেবা বা অন্য কোনোভাবে মুসলিম আইনের অধীনে সম্পত্তি হস্তান্তরে বাধা সৃষ্টি করবে না।
তিনি বলেন, নতুন আইনে যে ‘গিফট’ বা সম্পত্তি দানের কথা বলা হয়েছে, তা হেবা নয় এবং মুসলিম আইনের হেবা ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
আইনমন্ত্রী বলেন, সামাজিক বাস্তবতার কথা বিবেচনা করেই এই সংশোধনী আনা হয়েছে। বিশেষ করে সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাবা-মাকে নিজেদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা বিবেচনায় নিয়েই নতুন বিধান করা হয়েছে।
বিতর্কের একপর্যায়ে বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে গেলেও পরে তারা আবার ফিরে এসে আলোচনায় অংশ নেন। শেষ পর্যন্ত কণ্ঠভোটে বিরোধী দলের প্রস্তাবগুলো নাকচ হয়ে যায় এবং বিলটি পাস হয়।
সংশোধিত আইনে কী আছে?
নতুন ১২২এ ধারার অধীনে কোনো ব্যক্তি সম্পত্তি ‘দান’ বা ‘গিফট’ করার পরও জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ বা ব্যবহার করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। অর্থাৎ বাবা তার বাড়ি সন্তানের নামে হস্তান্তর করলেও দলিলে উল্লেখ করতে পারবেন যে, তিনি জীবিত থাকা পর্যন্ত বাড়িটি ব্যবহার ও ভোগ করবেন।
তবে এই সুবিধা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। নির্দিষ্ট রক্তের সম্পর্কের মধ্যে এ ধরনের হস্তান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বাবা-মা তাদের সন্তান বা নাতি-নাতনিকে, সন্তান বা নাতি-নাতনি বাবা-মাকে এবং স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে এ ধরনের শর্তযুক্ত সম্পত্তি দান করতে পারবেন।
নতুন ধারায় দানগ্রহীতা দাতার আগে মারা গেলে সম্পত্তির কী হবে, সেটিও নির্ধারণ করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সম্পত্তি দানগ্রহীতার আইনগত উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে। তবে দাতা যতদিন জীবিত থাকবেন, ততদিন তার জীবনকালীন ভোগদখলের অধিকার বহাল থাকবে।
অর্থাৎ বাবা ছেলের নামে বাড়ি লিখে দেওয়ার পর ছেলে যদি বাবার আগেই মারা যান, তাহলে বাড়িটি ছেলের আইনগত উত্তরাধিকারীদের কাছে যেতে পারে। তবে বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত বাড়িটি ব্যবহারের অধিকার তার থাকবে।
১২২বি ধারায় বাতিলের সুযোগ
নতুন ১২২বি ধারায় ১২২এ-এর অধীনে নিবন্ধিত দান বাতিলের বিষয়টিও নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, এ ধরনের দান সাধারণভাবে একতরফাভাবে বাতিল করা যাবে না। তবে দাতা ও দানগ্রহীতা উভয়ের সম্মতিতে তা বাতিল করা যেতে পারে। আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য কোনো প্রকৃত প্রয়োজনের মতো পরিস্থিতিতে এ ধরনের বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া কোনো পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অক্ষম বা আইনগতভাবে অক্ষম হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ জেলা জজের কাছে আবেদন করতে পারবেন। আদালত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নোটিশ দিয়ে প্রয়োজনীয় তদন্তের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
বাবা-মায়ের সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত হবে?
নতুন সংশোধনীর মূল লক্ষ্য হিসেবে সামনে এসেছে সম্পত্তি দান বা হস্তান্তরের পরও বাবা-মায়ের নিরাপত্তা ও ভোগদখলের অধিকার নিশ্চিত করা।
তবে একই সঙ্গে ইসলামি উত্তরাধিকার আইন, হেবা ও ওসিয়তের সঙ্গে সংশোধিত বিধানের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা চলছে। আইনজীবীদের মধ্যে যেখানে অনেকে এটিকে বাবা-মায়ের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, সেখানে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ইসলামি আইন ও উত্তরাধিকারীদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ফলে নতুন আইন বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে এর আইনি ব্যাখ্যা, দলিলের ভাষা এবং মুসলিম উত্তরাধিকার ও হেবা ব্যবস্থার সঙ্গে এর সম্পর্ক—এসব বিষয় ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
MM/AAM