বাণিজ্য ও প্রযুক্তিতে কানাডা-ইইউর বিস্তৃত অংশীদারিত্বের উদ্যোগ

কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ।
কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ।

মুক্তমন রিপোর্ট : বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়াতে বিস্তৃত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রভাবাধীন বৈশ্বিক ব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে দুই পক্ষ এ উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহে কানাডার মন্ট্রিয়লে অনুষ্ঠেয় শীর্ষ সম্মেলনে সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করবে দুই পক্ষ। বিদ্যমান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগের বাইরে গিয়ে সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চায় ব্রাসেলস ও অটওয়া।

গত সেপ্টেম্বরে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইন কানাডাকে ইইউর প্রথম সহযোগী সদস্য করার সম্ভাবনা তুলে ধরেন। তবে জোটটির বর্তমান চুক্তিতে ‘সহযোগী সদস্য’ নামে কোনো মর্যাদা নেই। তাই এ ধরনের অংশীদারিত্বের কাঠামো ও পরিধি নির্ধারণে ইইউর সদস্যদেশগুলোর মধ্যে আলোচনা প্রয়োজন। ইইউর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পূর্ণ সদস্যপদ না দিয়েও কানাডার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য থেকেই এ ধারণা এসেছে।

সম্ভাব্য অংশীদারিত্বের আওতায় জলবায়ু, জ্বালানি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে নীতিগত সমন্বয়, ইইউর বিভিন্ন কর্মসূচিতে কানাডার অংশগ্রহণ এবং যৌথ শাসন কাঠামো গড়ে তোলার বিষয় থাকতে পারে। পাশাপাশি ইইউর শীর্ষ সম্মেলন ও মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে কানাডার অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

কানাডার গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল মৃত্তিকা উপাদানের মজুত ইউরোপের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। ব্যাটারি, বায়ুকলসহ পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উৎপাদনে এসব উপাদান প্রয়োজন। বর্তমানে এসব খনিজের বড় অংশের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল ইউরোপের বিভিন্ন দেশ।

এ নির্ভরতা কমাতে কানাডার খনিজ খাতে ইউরোপীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের অর্থায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও অন্যান্য উপকরণের যৌথ মজুত গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, খনি প্রকল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণে দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তি ও নিশ্চিত বাজার গুরুত্বপূর্ণ। তাই কানাডার খনিজ খাতে ইউরোপের অংশগ্রহণ বাড়াতে দুই পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

মন্ট্রিয়ল সম্মেলনে অনলাইন লেনদেন সহজ করা এবং দ্রুত ও কম খরচে ডিজিটাল বাণিজ্যের সুযোগ বাড়াতে একটি চুক্তি ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো উন্নয়ন এবং এআই-সংক্রান্ত বিধিবিধান নিয়ে সহযোগিতা জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।

মহাকাশ প্রযুক্তিতেও সহযোগিতা বাড়াতে চায় দুই পক্ষ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যালিলিও বৈশ্বিক নেভিগেশন স্যাটেলাইট কর্মসূচি এবং আইআরআইএস² স্যাটেলাইট যোগাযোগ প্রকল্পে কানাডার অংশগ্রহণের পথ তৈরির বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

গ্যালিলিও যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএসের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, আইআরআইএস² প্রকল্পের লক্ষ্য ইউরোপের নিজস্ব স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা স্টারলিংকের মতো নেটওয়ার্কের বিকল্প হতে পারে।

এ ছাড়া সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে ইউরোপের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড, কানাডা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার যোগাযোগ সংযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোয় নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে চায় ইইউ।

কানাডাকে ইইউর ইরাসমাস যুব বিনিময় কর্মসূচিতে যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়াশোনা ও বিভিন্ন বিনিময় কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।

যৌথ বিবৃতির খসড়ায় তরুণ ও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের চলাচলের বাধা কমানো এবং পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি বাড়ানোর বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইইউর আইনপ্রণেতা টোবিয়াস ক্রেমার বলেন, চুক্তি ও প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ হলেও ইইউ-কানাডা অংশীদারিত্বের প্রকৃত ভিত্তি হলো মানুষে-মানুষে যোগাযোগ।

এদিকে, ইউক্রেনের বাজেট ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা দিতে কানাডাকে রাজি করানোর চেষ্টা করছে ইইউ। ইউরোপের গবেষণা অর্থায়ন কর্মসূচি হরাইজন ইউরোপে কানাডার অংশগ্রহণ এবং কানাডীয় গবেষকদের জন্য ইউরোপের সুপারকম্পিউটিং অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

জ্বালানি খাতেও সহযোগিতা বাড়াতে চায় কানাডা ও ইইউ। যৌথ বিবৃতির খসড়ায় কানাডা থেকে ইউরোপে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়নের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে কানাডার প্রতিষ্ঠান ডি হ্যাভিল্যান্ডের তৈরি ৫০টি অগ্নিনির্বাপক উড়োজাহাজ যৌথভাবে কেনার পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত রয়েছে। ইইউর সংকট ব্যবস্থাপনাবিষয়ক কমিশনার হাজা লাহবিব জানিয়েছেন, ২০২৪ সালেই এ ধরনের ২৪টি উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছে। জোটটির পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি বাজেট নিয়ে আলোচনা চলায় নতুন করে উড়োজাহাজ কেনার সুযোগ নেই।

ইউরোপের কয়েকটি দেশও নতুন করে কানাডীয় উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে। তাদের যুক্তি, ইইউর অর্থ ইউরোপীয় নির্মাতাদের তৈরি বিকল্প উড়োজাহাজ কেনার কাজে ব্যয় করা উচিত।

সম্মেলনের আলোচ্য বিষয়গুলো থেকে বোঝা যায়, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষার প্রচলিত সহযোগিতার বাইরে গিয়ে প্রযুক্তি, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, শিক্ষা ও গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চায় কানাডা ও ইইউ। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কৌশলগত ক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থায় নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে তাদের।

সূত্র : নিউজ২৪ / এএফপি

Muktomon/TA