জমির মালিকানা নিয়ে মুখোমুখি গণপূর্ত ও শেকৃবি

সচিবালয় স্থানান্তরে জটিলতা

সচিবালয় স্থানান্তরে জটিলতা

বিশেষ প্রতিবেদন : রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তরের সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত জায়গার মালিকানা নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) প্রশাসন। কৃষি গবেষণার স্বার্থে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের আন্দোলনে প্রকল্পের প্রাথমিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শেরেবাংলা নগরের মূল মহাপরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

গত ১৮ অক্টোবর মন্ত্রিসভার ২৫তম বৈঠকে আবদুল গনি রোডের বর্তমান সচিবালয় শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। ২০২৯ সালের মধ্যে নতুন স্থানে সচিবালয়ের কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জমিতে ১৪টি ১২ তলা ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কথা রয়েছে। তবে জমির মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে বিরোধ প্রকল্পটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দাবি, পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠের মোট ১৫৭ একর জমি তাদের নামে রেকর্ডভুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে জমিটির দেখভাল ও ভূমিসংক্রান্ত কার্যক্রমও মন্ত্রণালয় পরিচালনা করছে। অন্যদিকে শেকৃবি প্রশাসনের দাবি, কৃষি গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে বরাদ্দ দেওয়া জমির অংশ এটি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় দলিলপত্রও তাদের কাছে রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আরফান আলী জানান, ১৯৩৮ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক বেঙ্গল অ্যাগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পর কৃষি গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ২০০ একর জমি দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, হৃদরোগ ও পঙ্গু হাসপাতাল, পরিকল্পনা কমিশন এবং গণপূর্ত ভবন নির্মাণের জন্য জমি নেওয়া হয়। তাঁর দাবি, ১৯৮৮-৮৯ সালে এরশাদ সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল, ডেইরি ফার্ম ও মসজিদ সরিয়ে অস্থায়ীভাবে মেলার জন্য জমিটি নেওয়া হয়েছিল।

অধ্যাপক আরফান আলীর ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শিক্ষার্থীরা জমি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। কৃষি গবেষণা সম্প্রসারণ ও পরিবেশ সংরক্ষণের স্বার্থে জমিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ফিরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

আন্দোলনে বন্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম

জমি হস্তান্তরের দাবিতে গত ২৭ অক্টোবর থেকে আন্দোলন করছেন শেকৃবির শিক্ষার্থীরা। ওই দিন সচিবালয় নির্মাণের উদ্দেশ্যে মাঠে মাটি পরীক্ষার কাজ চলার সময় পরীক্ষার যন্ত্রপাতি ও গাড়ি ক্যাম্পাসে নিয়ে যান আন্দোলনকারীরা। পরদিন মাঠে মেলা বন্ধের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। ২৯ অক্টোবর সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। ওই দিনই মাঠে জাতীয় যুব মেলাসহ সব ধরনের মেলা স্থগিতের ঘোষণা দেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।

পরে মাঠের স্থাপনা অপসারণ না করা এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রতিবাদে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। শিক্ষার্থীরা মাঠটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণাও দেন। একপর্যায়ে পরীক্ষা বর্জন, ক্লাসে অংশ না নেওয়া এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শাটডাউনের সিদ্ধান্ত নেন তারা। বুধবার সহস্রাধিক শিক্ষার্থী চীন মৈত্রী সিগন্যালে অবস্থান নিলে ওই এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

মহাপরিকল্পনা অক্ষুণ্ণ রাখার সুপারিশ

সচিবালয় স্থানান্তরের বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে স্থাপত্য অধিদপ্তরের একটি প্রতিবেদন। এতে শেরেবাংলা নগরের প্রশাসনিক এলাকার মূল মহাপরিকল্পনা অক্ষুণ্ণ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ ভবন ও শেরেবাংলা নগরের প্রশাসনিক এলাকা স্থপতি লুই আই কানের প্রণীত মহাপরিকল্পনার অংশ। এ এলাকার ভূমি ব্যবহার ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন এলে সংসদ ভবনের আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যগত স্বীকৃতি অর্জনের প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬৪ সালে সংসদ ভবন নির্মাণের জন্য ৪০৮ একর জমি অধিগ্রহণের পর প্রশাসনিক এলাকার জন্য আরও ৫০০ একর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। লুই আই কানের পরিকল্পনায় সংসদ ভবনের উত্তর পাশে জাতীয় সচিবালয়সহ প্রশাসনিক ব্লক নির্মাণের প্রস্তাব ছিল। তবে স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনৈতিক ও সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।

স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে গাজীপুরের সালনায় বরাদ্দ করা জমিতে স্থানান্তরের প্রস্তাবও রয়েছে। অধিদপ্তরের মতে, প্রশাসনিক এলাকার মূল পরিকল্পনার সঙ্গে বিশেষায়িত কৃষি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সচিবালয় নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হওয়ায় একসময় জমিটি সবুজ পার্ক ও খেলাধুলার মাঠ হিসেবে সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক অবকাঠামোর সম্প্রসারণের প্রয়োজন বিবেচনায় জমিটি সচিবালয়ের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে সংরক্ষণের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

মালিকানা নিয়ে অনড় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব ওবায়দুর রহমানের দাবি, পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠের জমি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়; মাঠ ও বিভিন্ন স্থাপনাসহ মোট ১৫৭ একর জমি মন্ত্রণালয়ের নামে রেকর্ডভুক্ত। তাঁর বক্তব্য, সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভার এবং সেখানে সচিবালয় নির্মাণের অন্য কোনো বিকল্প নেই। এ বিষয়ে গণপূর্ত থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মাঠের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন গণপূর্ত সচিব। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে গবেষণার জমি থাকলেও সেগুলোর উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে সরকার অন্য জায়গায় হোস্টেল নির্মাণের জন্য জমি দিতে পারে বলেও জানান তিনি।

৩১ একর জমিতে ১৪টি ১২ তলা ভবনের পরিকল্পনা

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আবদুল গনি রোডে ১৭ দশমিক ৫৭ একর জমির ওপর সচিবালয়ের ১৩টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে আটটি ভবন স্বাধীনতার আগে নির্মিত। পুরোনো ভবনগুলোর কয়েকটি ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে এবং একটি ১৯৪৭ সালে নির্মিত হয়। ভূমিকম্প সহনশীল করে নির্মাণ না করায় এসব ভবনে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে সরকার। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাবও রয়েছে।

নতুন পরিকল্পনায় প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জমিতে মোট ৩৩ দশমিক ১৬ লাখ বর্গফুট আয়তনের অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে তিনটি বেজমেন্টসহ ১৪টি ১২ তলা ভবন থাকবে। ৩ হাজার ৮০০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা, মসজিদ, ৩৫০ জন ধারণক্ষমতার দুটি বহুমুখী হল, ক্যাফেটেরিয়া ও ডাকঘর নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গা সবুজায়ন ও জলাধারের জন্য রাখার কথা বলা হয়েছে।

সব মিলিয়ে সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত এখন জমির মালিকানা, কৃষি গবেষণার প্রয়োজন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং শেরেবাংলা নগরের ঐতিহাসিক মহাপরিকল্পনা—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে জমির মালিকানা ও ব্যবহারের অধিকারসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান সমন্বয় করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।