শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয় ও কারখানার সক্ষমতা—দুই হিসাব মিলিয়ে মজুরি নির্ধারণের তাগিদ
আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ : পোশাকশ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি কত হওয়া উচিত—এ প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিকের পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কারখানাগুলোর নিয়মিত মজুরি পরিশোধের সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ বেতন বাড়ানোর ঘোষণা দিলেই শ্রমিকের জীবনমানের উন্নতি হয় না; সেই অর্থ সময়মতো হাতে পাওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের একটি পোশাক কারখানায় সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করেন নাসিমা আক্তার। মাসে তার আয় ১৪ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু চাল, ডাল, তেল, সবজি ও বাড়িভাড়া মেটানোর পর ছয় সদস্যের সংসারে ছেলের এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকাও জোগাড় করতে পারেননি তিনি। অন্যদিকে গাজীপুরের পোশাকশ্রমিক লাকি ওভারটাইমসহ মাসে ২১ হাজার ৯০০ টাকা আয় করেও দুই সন্তানসহ চার সদস্যের সংসার চালাতে ঋণ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এই দুই শ্রমিকের অভিজ্ঞতা পোশাকশিল্পের মজুরি বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। আয় থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে। প্রশ্ন উঠেছে, বর্তমান বাজারে একটি শ্রমিক পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে কত টাকা দরকার এবং সেই মজুরি দেওয়ার সামর্থ্য কারখানাগুলোর কতটা রয়েছে?
গত ১ নভেম্বর সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বেড়েছে, মজুরি বেড়েছে তার তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে মালিকপক্ষের বক্তব্য, উৎপাদন খরচ, জ্বালানি, ঋণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার চাপের মধ্যে বড় অঙ্কের মজুরি বৃদ্ধি বাস্তবায়ন করা কঠিন। নতুন মজুরি বোর্ডের সামনে তাই শ্রমিকের প্রয়োজন ও শিল্পের সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চ্যালেঞ্জ।
৪২ বছরের মজুরি ইতিহাসে বড় পরিবর্তন
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে প্রথম ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর বহুল আলোচিত অঙ্ক ছিল ৬২৭ টাকা। সময়টি ১৯৮৪-৮৫ সালের দিকে। তবে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসের একটি গ্রন্থে প্রথম মজুরি বোর্ডের অঙ্ক ৫৬০ টাকা উল্লেখ রয়েছে। মূল সরকারি প্রজ্ঞাপন ছাড়া এই পার্থক্যের নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালের জুনে মোটা চালের গড় সর্বনিম্ন খুচরা দাম ছিল কেজিপ্রতি ৭ টাকা ১২ পয়সা। সে হিসাবে ৬২৭ টাকা দিয়ে প্রায় ৮৮ কেজি চাল কেনা যেত। তবে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও পোশাকসহ অন্যান্য প্রয়োজনও তখন শ্রমিক পরিবারের ব্যয়ের অংশ ছিল।
পরবর্তী সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে। ১৯৮৮ সালের ঢাকা পৌর এলাকার বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতির জরিপে মাসিক বাড়িভাড়ার প্রচলিত সীমা ছিল ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। বর্তমানে গাজীপুরের একজন পোশাকশ্রমিকের বাসাভাড়া চার হাজার টাকা। আবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ।
২০১৪ সালের এক মাঠসমীক্ষায় সাভার, আশুলিয়া ও উত্তরার ৪৭টি কারখানার ২৫০ জন শ্রমিকের পরিবারের মাসিক ন্যূনতম প্রয়োজনের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১১ হাজার ৩০০ টাকা। খাবার, বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও পোশাকের খরচ মিলিয়ে এই হিসাব করা হয়েছিল। অথচ তখন একজন শ্রমিক ওভারটাইমসহ আয় করতেন ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। সংসার চালাতে পরিবারের একাধিক সদস্যের আয় কিংবা বাড়তি কর্মঘণ্টার প্রয়োজন হতো।
বর্তমান বাজারে ১২ হাজার ৫০০ টাকার মজুরি কতটা যথেষ্ট?
পোশাক খাতে সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় ২০২৩ সালে। তখন প্রারম্ভিক মজুরি আট হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়। ওই বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া এ বৃদ্ধির হার ছিল ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।
কিন্তু মূল্যস্ফীতির কারণে সেই মজুরির ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। বিডিপলিসিল্যাবের হিসাবে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারিত মজুরি পরবর্তী মূল্যস্ফীতিতে ক্রয়ক্ষমতার বিচারে ২২ দশমিক ৩ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে। এই ক্ষয় পুষিয়ে আগের অবস্থায় ফিরতে প্রয়োজন প্রায় ১৬ হাজার ১০০ টাকা। অর্থাৎ এই অঙ্কে পৌঁছানো মানে জীবনমানের উন্নতি নয়, বরং হারানো ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার।
বর্তমান বাজারের একটি সাধারণ হিসাবও সংকটটি স্পষ্ট করে। টিসিবির ২০২৬ সালের ৩০ অক্টোবরের হিসাবে ঢাকায় মাঝারি চালের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৫৬ থেকে ৬৫ টাকা। একই সময়ে ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা, ডিম ডজনপ্রতি ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা এবং বিভিন্ন সবজির দাম ছিল ৬০ থেকে ১০০ টাকা।
ধরা যাক, একজন শ্রমিক মাসে ছয় হাজার ৫০০ টাকা বাড়িভাড়া দেন। ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি থেকে বাড়িভাড়া বাদ দিলে হাতে থাকে ছয় হাজার টাকা। ৩০ কেজি চাল, তিন কেজি ডাল, ৩০টি ডিম ও পাঁচ লিটার তেল কিনতেই খরচ হয় প্রায় তিন হাজার ৫০০ টাকা। বাকি থাকে আড়াই হাজার টাকা। অথচ মাছ, সবজি, জ্বালানি, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ তখনো বাকি। এই হিসাব পূর্ণাঙ্গ পুষ্টিকর খাদ্যতালিকাও নয়।
জীবনধারণযোগ্য মজুরি ও শ্রমিক সংগঠনের দাবি
জীবনধারণযোগ্য মজুরি নিয়ে গবেষণাতেও বর্তমান ন্যূনতম মজুরির চেয়ে বেশি অঙ্ক উঠে এসেছে। আঙ্কার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের হালনাগাদ হিসাবে, ঢাকা শহরের জন্য একজন পূর্ণকালীন শ্রমিকের মাসিক মজুরি হওয়া প্রয়োজন ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা। আশপাশের শিল্পাঞ্চলের জন্য এই অঙ্ক ২৫ হাজার ১৬৬ টাকা।
ঢাকার হিসাবটিতে চার সদস্যের পরিবার, গড়ে ১ দশমিক ৫৮ জন উপার্জনকারী এবং পরিবারের মোট ন্যূনতম ব্যয় ৪৮ হাজার ২২ টাকা ধরা হয়েছে। ফলে এই অঙ্ককে পরিবারের মোট প্রয়োজনীয় ব্যয় হিসেবে দেখা যাবে না; এটি একাধিক উপার্জনকারী ধরে হিসাব করা ব্যক্তিপ্রতি মজুরি।
অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর মজুরি দাবি ৩০ হাজার টাকা থেকে ৩৭ হাজার ১২৫ টাকার মধ্যে। এসব দাবিতে শুধু মোট টাকার অঙ্কের পার্থক্য নয়, মূল মজুরি ও ভাতার অনুপাত নিয়েও ভিন্নতা রয়েছে।
এখানে আলোচনার জন্য কয়েকটি অঙ্ক গুরুত্বপূর্ণ: মূল্যস্ফীতিতে ক্ষয় হওয়া ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে প্রায় ১৬ হাজার ১০০ টাকা, গবেষণাভিত্তিক জীবনধারণযোগ্য মজুরি ২৫ হাজার ১৬৬ থেকে ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি ৩০ হাজার থেকে ৩৭ হাজার ১২৫ টাকা।
অতীতের মজুরি বৃদ্ধির হার বিবেচনা করলেও একটি তুলনামূলক ধারণা পাওয়া যায়। আগের চার দফার বৃদ্ধির হার বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকার ওপর প্রয়োগ করলে সম্ভাব্য প্রারম্ভিক মজুরি দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৯০০ থেকে ২২ হাজার ৬০০ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা করতে হলে মজুরি বাড়াতে হবে ১৪০ শতাংশ, যা আগের চার দফার প্রতিটি বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি।
তবে অতীতের বৃদ্ধির হার বর্তমান সময়ের শ্রমিকের প্রয়োজন নির্ধারণের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া, প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এবং পোশাকশিল্পের বর্তমান অবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে।
শ্রমিকের পাঁচ হাজার টাকা বাড়তি, কারখানার ব্যয় ৫০ লাখ
মজুরি বাড়ানোর ক্ষেত্রে কারখানার সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি কারখানায় এক হাজার শ্রমিকের প্রত্যেকের বেতন মাসে পাঁচ হাজার টাকা বাড়লে সরাসরি বেতন ব্যয় বাড়বে ৫০ লাখ টাকা। বছরে এই অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে ছয় কোটি টাকা। মূল মজুরি বৃদ্ধির কারণে ওভারটাইম ও সংশ্লিষ্ট পাওনাও বাড়লে ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
তবে শ্রমিকের মজুরি যে হারে বাড়বে, কারখানার মোট উৎপাদন ব্যয়ও একই হারে বাড়বে—এমন নয়। উদাহরণ হিসেবে, কোনো কারখানার মোট উৎপাদন ব্যয়ের ২০ শতাংশ শ্রমব্যয় হলে এবং শ্রমব্যয় ৫০ শতাংশ বাড়লে অন্য সব খরচ অপরিবর্তিত থাকার শর্তে মোট উৎপাদন ব্যয় বাড়বে ১০ শতাংশ।
অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাব বুঝতে কারখানার ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কাঁচামাল, ঋণের সুদ, জ্বালানি, পরিবহন ও ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের তুলনায় শ্রমব্যয়ের অংশ কত, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
স্পারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম মজুরি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও শিল্পের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় শ্রমিকের দক্ষতার বিষয়টিও তিনি সামনে এনেছেন। অন্যদিকে শাশা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ অক্টোবর-ডিসেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি মৌসুমে ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছেন।
বড় রপ্তানিকারক ও ছোট সাব-কন্ট্রাক্টিং কারখানার আর্থিক সক্ষমতা এক নয়। বিশ্ববাজারে চাহিদা কমা, জ্বালানি অনিশ্চয়তা কিংবা সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের মতো বিষয়ও উৎপাদন ব্যয়ে প্রভাব ফেলে। তবে এসব চ্যালেঞ্জের কারণে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির প্রয়োজন উপেক্ষা করা যায় না।
অটোমেশন ও কর্মসংস্থানের ঝুঁকি
মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থান রক্ষার বিষয়টিও আলোচনায় আসছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কিছু কারখানা কম শ্রমিক দিয়ে উৎপাদন চালাতে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে পারে। তবে অটোমেশনের জন্য বিনিয়োগ ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন। সব কারখানার সেই সক্ষমতা নেই।
২০২৫ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত এক গবেষণায় ৪২৯ জন শ্রমিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অটোমেশনের পর জরিপে অন্তর্ভুক্ত উৎপাদন লাইনে শ্রমিকসংখ্যা গড়ে ৩০ দশমিক ৫৮ শতাংশ কমেছে। বেশি চাপে পড়েছেন হেলপাররা। তবে এটি সারা দেশের চাকরি হারানোর হার নয়; স্থানচ্যুত শ্রমিকদের একাংশকে অন্য বিভাগেও নেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালে ‘দ্য ইন্ডিয়ান জার্নাল অব লেবার ইকোনমিকস’-এ প্রকাশিত আরেক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে উৎপাদনশীলতা ৩০ শতাংশ বাড়লে বাংলাদেশের উৎপাদনশিল্পে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার কর্মসংস্থান কমতে পারে—যদি অন্যান্য পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকে। এটি শুধু পোশাকশিল্পের হিসাব নয়, তবে বস্ত্র ও পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এই গবেষণাগুলো মজুরি বৃদ্ধির কারণে চাকরি হারানোর হিসাব নয়; প্রযুক্তিগত পরিবর্তনে কর্মসংস্থানের ঝুঁকি তুলে ধরে। তাই নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি পুরোনো শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন কাজের উপযোগী করে তোলার উদ্যোগও প্রয়োজন।
মজুরি নির্ধারণে সরকারের ভূমিকা জরুরি
শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে শুধু কারখানার মজুরি বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করলে হবে না। সাশ্রয়ী আবাসন, গণপরিবহন, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে সহায়তা শ্রমিকের পরিবারের ব্যয় কমাতে পারে। নির্ভরযোগ্য গ্যাস-বিদ্যুৎ, সহজ অর্থায়ন এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ কারখানার ওপর চাপ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
একই বাজারে অন্য খাতের শ্রমিকেরাও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে রয়েছেন। ২০২৪ সালের কাঠামোয় ট্যানারি খাতে বিভাগীয় শহর ও সাভারের জন্য ন্যূনতম মজুরি ১৮ হাজার ১ টাকা। ২০২৫ সালের হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের কাঠামোয় এক তারকা হোটেল ও সর্বোচ্চ ১০০ আসনের রেস্তোরাঁর সর্বনিম্ন গ্রেডের মজুরি ১৩ হাজার ৫০ টাকা। কাজের ধরন আলাদা হলেও খাদ্য, বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসার ব্যয় সব খাতের শ্রমিকের জীবনেই প্রভাব ফেলে।
শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়মিত বেতন
নতুন মজুরি বোর্ডের সামনে তাই শুধু একটি অঙ্ক নির্ধারণের কাজ নেই। শ্রমিকের পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন, কারখানার প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা, বিদেশি ক্রেতাদের মূল্য নির্ধারণের ভূমিকা এবং সরকারের সহায়তা—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।
এক ধাপে বড় অঙ্কের মজুরি বৃদ্ধি কিছু কারখানার জন্য কঠিন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বৃদ্ধির সময়সূচি, লক্ষ্যভিত্তিক সরকারি সহায়তা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বড় রপ্তানিকারক ও ছোট সাব-কন্ট্রাক্টিং কারখানার সক্ষমতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
তবে মালিকের সক্ষমতার যুক্তিতে শ্রমিকের ন্যূনতম প্রয়োজন উপেক্ষা করা যাবে না। আবার এমন মজুরি কাঠামোও কার্যকর হবে না, যা ঘোষণার পর নিয়মিত পরিশোধ করা সম্ভব নয়।
নাসিমা আক্তারের ছেলের পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকা যেন তার নিয়মিত বেতন থেকেই আসে, সেটিই মজুরি বৃদ্ধির বাস্তব সাফল্য। শ্রমিকের সংসারে স্বস্তি আনার পাশাপাশি কারখানার কর্মসংস্থান ও উৎপাদন সচল রাখার মতো কাঠামোই হতে পারে নতুন মজুরি বোর্ডের সামনে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।