মুক্তমন রিপোর্টার : সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরার অনেক গ্রামের পুরুষ প্রতিবছর প্রায় ছয় মাসের জন্য ইটভাটায় চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে চলে যান। অক্টোবরে বাড়ি ছাড়ার পর তারা সাধারণত এপ্রিলের শুরুতে ফিরে আসেন। এই সাময়িক অভিবাসন শুধু পুরুষদের কর্মসংস্থানের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঘরে থেকে যাওয়া নারীদের শ্রম, দায়িত্ব, অপেক্ষা ও আত্মনির্ভরতার এক ভিন্ন বাস্তবতা।
২০২৪-২৫ সালে সুন্দরবনের বনসংলগ্ন জনগোষ্ঠীর ওপর এক বছরব্যাপী গবেষণার সময় দেখা যায়, ২০ থেকে ৫০ বছর বয়সী অনেক পুরুষ মাছ ধরা, কাঁকড়া ধরা কিংবা বন থেকে মধু সংগ্রহের মতো ঐতিহ্যগত জীবিকা ছেড়ে মৌসুমি শ্রমের জন্য দূরের ইটভাটায় যাচ্ছেন। সেখানে তারা সাধারণত সর্দার-এর মাধ্যমে শ্রমচুক্তিতে যুক্ত হন।
এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু বেশি মজুরির আকর্ষণ কাজ করছে না। সুন্দরবনে সংরক্ষণমূলক বিধিনিষেধ, মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা, প্রবেশের অনুমতি ও সীমাবদ্ধতার কারণেও বননির্ভর মানুষের জীবিকা সংকুচিত হচ্ছে। বছরের শুরুতে দুই মাস কাঁকড়া ধরা নিষিদ্ধ থাকে। বর্ষায় তিন মাস বন্যপ্রাণীর প্রজনন রক্ষায় বনে প্রবেশ বন্ধ থাকে। এ ছাড়া সুন্দরবনের প্রায় অর্ধেক এলাকাজুড়ে থাকা অভয়ারণ্যেও প্রবেশ নিষিদ্ধ।
বন বিভাগ এসব পদক্ষেপকে বন ও বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করে। তবে বন বন্ধ থাকলে স্থানীয় মানুষের বিকল্প আয়ের সুযোগ খুবই সীমিত। ভূমিহীনতা, ঋণ, চিংড়ি চাষের কারণে কৃষিশ্রমের সুযোগ কমে যাওয়া এবং কম মজুরি—সব মিলিয়ে পরিবারগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে পুরুষদের জন্য ইটভাটায় মৌসুমি শ্রম একটি বিকল্প হয়ে ওঠে।
নির্মলা নামের এক নারীর অভিজ্ঞতা দেখায়, স্বামীর অনুপস্থিতি সবসময় শুধু কষ্ট বা অসহায়ত্ব তৈরি করে না। স্বামীর পাঠানো বিকাশের টাকা দিয়ে তিনি কয়েকটি ছাগল কিনেছিলেন। স্থানীয় একটি এনজিওর তৈরি ছাগলের ঘরও তিনি পুনরায় ব্যবহার করছিলেন। বাজার থেকে খাবার কিনে ছাগলগুলো লালন-পালন করছিলেন, যাতে ঈদের বাজারে বিক্রি করতে পারেন।
স্বামী দূরে থাকলেও মোবাইল ফোন তাদের যোগাযোগ সহজ করেছে। নির্মলা জানান, তার মেয়ে প্রায় প্রতিদিন বাবার সঙ্গে কথা বলে। ভিডিও কলে যোগাযোগের কারণে স্বামীর অনুপস্থিতি তার কাছে আগের মতো কঠিন মনে হয় না। বরং স্বামীর অনুপস্থিতির সময়ে তিনি নিজের মতো করে সংসার পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করেছেন।
তার ভাষায়, তিনি শক্তিশালী; কিন্তু একই সঙ্গে স্বামীর জন্য অপেক্ষাও করেন। অর্থাৎ অপেক্ষা এখানে নিষ্ক্রিয় কোনো অবস্থা নয়। সংসারের পরিকল্পনা, কাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েই সেই অপেক্ষা এগিয়ে চলে।
শুশিলার অভিজ্ঞতা আবার ভিন্ন। তার স্বামী ও বড় ছেলে দুজনই ইটভাটায় কাজ করতে যান। বাড়িতে থাকা শুশিলার ওপর বাজার করা, শ্বশুরকে হাসপাতালে নেওয়া এবং মেয়ের স্কুলে অভিভাবক হিসেবে যাওয়া—এ ধরনের দায়িত্বও এসে পড়ে।
তিনি মনে করেন, কিছু কাজ এখনো পুরুষের দায়িত্ব হিসেবেই সমাজে দেখা হয়। স্বামী বা ছেলে বাড়িতে থাকলে তাকে এসব কাজ করতে হতো না। ফলে স্বামীর পাঠানো টাকা সংসারের অর্থনৈতিক চাপ কমালেও দৈনন্দিন বাস্তব দায়িত্ব কমায়নি।
তবু এপ্রিলের অপেক্ষা তার কাছে আনন্দের। স্বামী ও ছেলে ফিরে এলে তিনি বাবার বাড়িতে যাবেন—এই প্রত্যাশাই তাকে অপেক্ষা করায়। তিনি বলেন, এপ্রিলের পর তাকে দেখলে সবসময় হাসিমুখেই দেখা যাবে।
সুন্দরবনের নারীদের এই অভিজ্ঞতা দেখায়, পুরুষের মৌসুমি অভিবাসনকে শুধু যাতায়াত, মজুরি ও রেমিট্যান্সের দৃষ্টিতে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। একজন পুরুষ ইটভাটায় চলে যান, আর একজন নারী ঘরে থেকে সেই অনুপস্থিতিকে কার্যকরভাবে সামলে নেন। তিনি টাকার অপেক্ষা করেন, ফোনকলের অপেক্ষা করেন, ফিরে আসার অপেক্ষা করেন—এবং সেই অপেক্ষার মধ্যেই সংসারের কাজ চালিয়ে যান।
সুতরাং সুন্দরবনের অভিবাসনের গল্প শুধু পুরুষদের চলে যাওয়ার গল্প নয়; এটি ঘরে থাকা নারীদের শ্রম, দায়িত্ব, স্বাধীনতা, আশা এবং অপেক্ষারও গল্প।