রাজনৈতিক সংঘাত এড়িয়ে ঐক্য ও সহনশীলতার আহ্বান রাষ্ট্রপতির

ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

মুক্তমন রিপোর্ট : ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো ধরনের সংঘাত-সংঘর্ষ চান না বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সহনশীলতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার করা যাবে, তবে কোনোভাবেই সংঘাতে জড়ানো উচিত নয়।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের বড় মাঠে নাগরিক কমিটি আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ শান্তিপ্রিয় ও নির্ঝঞ্ঝাট। এ পরিবেশ বজায় রাখতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের রাজনীতি করবে, মতবাদ প্রচার করবে; কিন্তু কোনো ধরনের সংঘাতে জড়ানো যাবে না।

তিনি বলেন, অতীতে গণতন্ত্রকামী মানুষের ওপর নির্যাতন, গ্রেপ্তার ও মিথ্যা মামলার ঘটনা ঘটেছে। অনেক শ্রমিক-কৃষককে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। অনেক ত্যাগ ও রক্তপাতের বিনিময়ে দেশ আজকের অবস্থানে এসেছে। ভবিষ্যতে আর কোনো রক্তপাত বা সংঘাত দেখতে চান না তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতন্ত্র রক্ষায় রাজনৈতিক সহনশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে এমন একটি সমঝোতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করতে পারবেন।

ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া প্রতিশ্রুতির মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বাস্তবায়িত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি নির্ধারণ ও অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে এবং শিগগিরই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে।

তিনি জানান, ঠাকুরগাঁওয়ে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আগামী বছর থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হওয়ার আশা রয়েছে।

এ ছাড়া ভূল্লী ও রুহিয়াকে পৃথক উপজেলা করার দাবিও বাস্তবায়িত হয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রপতি। সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা দায়িত্ব নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছেন।

ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালুর বিষয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিমানবন্দর চালু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যোগাযোগ সহজ হবে। তবে বিমানবন্দরকে টেকসই করতে হলে জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও শিল্পায়ন বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান কম থাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে সরকার কাজ করছে। অর্থ উপদেষ্টা ও বাণিজ্যমন্ত্রী ইতোমধ্যে ঠাকুরগাঁও সফর করে সম্ভাবনা পর্যালোচনা করেছেন। কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে শিগগিরই বিনিয়োগকারীদের এখানে আনার চেষ্টা করা হবে।

চীনের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়টি তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে চীনের রাষ্ট্রদূত সফর করেছেন এবং স্থানীয় শিশুদের মধ্যে স্কুলব্যাগ বিতরণ করেছেন। এ ছাড়া কয়েকজন শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে চীন সফরের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে শিল্পকারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে চীন থেকে বিশেষজ্ঞ আসতে পারেন বলেও জানান তিনি।

তরুণ সমাজের প্রতি মাদকবিরোধী অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, মাদককে বর্জন করতে হবে এবং ঠাকুরগাঁওকে মাদকমুক্ত জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে।

ব্যবসায়ীদের আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু চাকরি বা ঠিকাদারির পেছনে না ছুটে নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরির চেষ্টা করতে হবে। উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগ বাড়লে জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও শক্তিশালী হবে।

প্রবাসে কর্মসংস্থানের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, মালয়েশিয়ায় প্রায় ১০ হাজার কর্মী নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীর সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, পদ পরিবর্তন হলেও ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রয়োজন হলে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি যথাসাধ্য সবার সঙ্গে দেখা করার আশ্বাস দেন।

নিজের শৈশব ও শিক্ষাজীবনের স্মৃতিচারণ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঠাকুরগাঁওয়ে। এখানকার শিক্ষকদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ। তারা তাকে সততা, নেতৃত্ব ও জীবনের পথে চলার শিক্ষা দিয়েছেন।

তিনি সবাইকে ঐক্য, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে স্বাধীনতা, মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষায় কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানের শেষে ঠাকুরগাঁওবাসীর শান্তি, সুখ, সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য কামনা করেন রাষ্ট্রপতি।

নাগরিক সংবর্ধনা কমিটির আহ্বায়ক ডা. আবু মো. খয়রুল কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সংসদ সদস্য, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর এটি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে প্রথম সফর। দুই দিনের সরকারি সফরে রোববার দুপুরে হেলিকপ্টারে করে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে পৌঁছান। সফরের দ্বিতীয় দিন সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কথা রয়েছে।