মুক্তমন রিপোর্ট : বগুড়া জেলা পুলিশের বিভিন্ন বিল-ভাউচারে জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি টাকার বেশি সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় জেলা পুলিশের ছয় সদস্য, একজন সিভিল কর্মচারী ও জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের এক অডিটরসহ মোট আটজনের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
ঘটনার পর অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ, ব্যাংক হিসাবের লেনদেন, বিল-ভাউচার, অনলাইনে দাখিল করা তথ্য এবং সরকারি নথিপত্র যাচাই করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আত্মসাৎ করা অর্থের সঠিক পরিমাণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটি।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে যাঁদের নাম এসেছে তাঁরা হলেন—বগুড়া পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের অফিস সহকারী রাজিবুল ইসলাম, কনস্টেবল আসাদুজ্জামান আরিফ, আমিরুল ইসলাম, নাসির উদ্দীন, রাজু আহম্মেদ ও সোলাইমান হোসেন, জেলা বিশেষ শাখায় কর্মরত এএসআই কমল হোসেন এবং জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের অডিটর ফিরোজ আলম।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলা পুলিশের বিভিন্ন টিএ-ডিএসহ অন্যান্য বিল-ভাউচার তৈরি করে অনলাইনে দাখিল করা হতো। পরে জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট অডিটর সেসব বিল যাচাই ও অনুমোদন করতেন। অনুমোদনের পর বিলের অর্থ সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের ব্যাংক হিসাবে জমা হতো।
অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া কিংবা অতিরিক্ত বিল তৈরি করে সরকারি অর্থ উত্তোলনের পর তা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রাথমিক তথ্যমতে, গত এক বছরে এভাবে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এর আগেও কয়েকজনের ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তদন্ত কমিটির এক সদস্য জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে বগুড়া পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক মানিকুর রহমান বিভিন্ন পুলিশ সদস্যের বিল-ভাউচার যাচাইয়ের সময় অসংগতি দেখতে পান। বিষয়টি তিনি পুলিশ সুপারকে জানান।
এরপর অফিস সহকারী রাজিবুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্ত কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন এবং ঘটনায় আরও সাতজনের নাম জানান। পরে এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর গত ২৬ আগস্ট বগুড়া পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আসাদুজ্জামানকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন।
কমিটি ইতোমধ্যে অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। পাশাপাশি তাঁদের ব্যাংক হিসাবের লেনদেনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথিপত্র যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্ত কমিটির একজন সদস্যের তথ্য অনুযায়ী, কমিউনিটি ব্যাংকের বগুড়া শাখায় কনস্টেবল আসাদুজ্জামান আরিফের হিসাবে ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া অভিযুক্ত এএসআই কমল হোসেনের হিসাবে গত এক বছরে প্রায় ৩২ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটি। অন্য কয়েকজন পুলিশ সদস্যের হিসাবেও ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা করে লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
তবে এসব লেনদেনের মধ্যে তাঁদের নিয়মিত বেতন, বৈধ টিএ বিল কিংবা অন্যান্য বৈধ লেনদেনের পরিমাণ কত, তা এখনো যাচাই করা হচ্ছে। এজন্য ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিল-ভাউচার ও সরকারি নথির মিল খুঁজে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত কমিটির আরেক সদস্য জানান, অফিস সহকারী রাজিবুল ইসলাম ও জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের অডিটর ফিরোজ আলমের ব্যাংক হিসাবে অভিযোগে উল্লেখ করা অর্থ সরাসরি জমা হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, রাজিবুল ও ফিরোজ যৌথভাবে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি ও অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতেন। এরপর ছয় পুলিশ সদস্যের ব্যাংক হিসাবে টাকা স্থানান্তর করা হতো এবং পরে সেই অর্থ ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হয়েছে বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটি।
অভিযুক্ত এক পুলিশ সদস্য দাবি করেছেন, তাঁর ব্যাংক হিসাবে আড়াই লাখ টাকা পাঠানো হলেও তিনি সেখান থেকে ৫০ হাজার টাকা পেয়েছেন। বাকি দুই লাখ টাকা ব্যাংক থেকে তুলে অফিস সহকারী রাজিবুলকে দিতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে এএসআই কমল হোসেন তাঁর ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৩২ লাখ টাকা লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করলেও এসব টাকার উৎস সম্পর্কে তিনি জানেন না বলে দাবি করেছেন।
তিনি জানান, বিভিন্ন সময়ে তাঁর হিসাবে টাকা জমা হতো। তবে টাকাগুলো কোথা থেকে আসত, তা তিনি খোঁজ নেননি। বিষয়টি তদন্ত কমিটি যাচাই করছে।
অভিযুক্ত কনস্টেবল আসাদুজ্জামান আরিফের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর কর্মস্থল আদমদীঘির চাপাপুর পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়েও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
অফিস সহকারী রাজিবুল ইসলাম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে দুই দিন গিয়ে অডিটর ফিরোজ আলমকে পাওয়া যায়নি। ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি চিকিৎসকের কাছে থাকার কথা জানিয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানান। এরপর একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি।
চার সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আসাদুজ্জামান বলেন, তদন্ত শুরু হয়েছে। যাঁদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে, তাঁদের শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যে আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ কোটি টাকার ওপরে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আত্মসাৎ করা অর্থের সঠিক পরিমাণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
তদন্ত কমিটি বর্তমানে অভিযুক্তদের ব্যাংক হিসাব, বিল-ভাউচার, অনলাইনে দাখিল করা তথ্য এবং জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের অনুমোদনসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করছে। তদন্ত শেষ হলে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।