নারী-শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন জোরদারের আহ্বান

নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন এবং সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ নিয়ে মতবিনিময় সভা
নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন এবং সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ নিয়ে মতবিনিময় সভা

মুক্তমন রিপোর্ট : নারী ও শিশুর প্রতি নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক হামলা, মব সহিংসতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। একই সঙ্গে এসব ঘটনা প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত, সঠিক তথ্য সংগ্রহ, স্থানীয় পর্যায়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং সাংস্কৃতিক জাগরণ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।

নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি নির্যাতন এবং সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সভায় সামাজিক অনাচারের ঘটনাগুলো কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ, প্রতিরোধ ও প্রতিকারে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়।

অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশুর প্রতি নির্যাতনের প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে ছেলেশিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে সামনে আসছে। ধর্মীয় পরিচয় ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন নির্যাতনের ঘটনায় লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, ভুক্তভোগীকে দায়ী করার প্রবণতা বা ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ বাড়ছে এবং সামাজিক রীতিনীতিতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গত দেড় বছরে এসব প্রবণতা সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্রকে আরও দৃশ্যমান করেছে। সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধে ঘটনার সঠিক মনিটরিং এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বিশিষ্ট জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বাসুদেব ধর বলেন, বিভিন্ন ধরনের অনাচারের ঘটনা নিয়মিত প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সাম্প্রদায়িক হামলার বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। গত দেড় বছরে মব সহিংসতাও শক্তিশালী হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এসব প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন বাসুদেব ধর।

মুক্তিযোদ্ধা ও ‘আমরা ৭১’-এর সভাপতি মাহবুব জামান বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রচারণার কারণে সমাজ নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। নারী ও শিশুর প্রতি অনাচার প্রতিরোধে তথ্যপ্রযুক্তির ইতিবাচক ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ কমিটির কার্যক্রম তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেন মেঘনাগুহ ঠাকুরতা। তিনি বলেন, কেন্দ্রের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়েও আন্দোলন ও কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ের কর্মসূচিগুলোর প্রচার বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন ড. আরসাদ চৌধুরী বলেন, নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে প্রচলিত গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলোকেও বিবেচনায় নিতে হবে। অনলাইন রিপোর্টের ভিত্তিতে ভুক্তভোগীদের সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষক ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দার বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে সরকারের আরও কার্যকর ভূমিকার আহ্বান জানান।

গ্রিন ভয়েস বহ্নিশিখার সমন্বয়ক আলমগীর কবির বলেন, বর্তমানে বিকৃত ইতিহাসের চর্চা ও প্রচারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে দেশীয় সংস্কৃতির একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দেশীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, সামাজিক অনাচার প্রতিরোধে নারী-পুরুষের বিভাজনের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে আরও সোচ্চার হতে হবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়ের পাশাপাশি তরুণ ও ডিজিটাল স্বেচ্ছাসেবক গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যেকোনো ধরনের হয়রানির বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে এবং সমাজে সাংস্কৃতিক জাগরণ সৃষ্টি করতে হবে।

জাতীয় কমিটির সদস্য লূনা নুর বলেন, রাষ্ট্রের দায় ও দায়িত্বকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। যেসব নীতি ও সিদ্ধান্ত নারী ও শিশুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

ফেরদৌসী সুলতানা বলেন, নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি অনাচার প্রতিরোধে আন্দোলনের পাশাপাশি অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ কমিটির সদস্যদের নিয়ে একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বিবার্তা২৪ ডটনেটের বিশেষ প্রতিবেদক ও উইমেন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের কো-অর্ডিনেটর আঙ্গুর নাহার মন্টি বলেন, সামাজিক অনাচার প্রতিরোধে কমিটিকে বহুমাত্রিক বা মাল্টিসেক্টরাল পদ্ধতিতে কাজ করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

মতবিনিময় সভায় সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেত্রী ও কর্মকর্তাসহ প্রায় ১০০ জন অংশ নেন।

সভায় সভাপতিত্ব করেন নারী ও কন্যা নির্যাতন এবং সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম।

নারী ও কন্যা নির্যাতন এবং সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক এবং
সভাপতি
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ

Muktomon/TA