মধ্যপ্রাচ্য-ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে ভারতে পুতিন

ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন
ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন

মুক্তমন রিপোর্ট : মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

শুক্রবার এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

দুই দিনের ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংয়ের সঙ্গেও মোদির বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

রুশ বার্তা সংস্থা রিয়া নভোস্তির প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, নয়াদিল্লির পালাম বিমানঘাঁটিতে পৌঁছানোর পর পুতিনকে অভ্যর্থনা জানান ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং।

এবারের সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংয়ের ভারত সফরও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০১৯ সালের পর এটিই তার প্রথম ভারত সফর।

২০২০ সালে হিমালয় সীমান্তে ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘদিন উত্তেজনা ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার পথে এগোচ্ছে।

দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ, ভিসা কার্যক্রম ও উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ধীরে ধীরে পুনরায় চালু হচ্ছে। তবে বিতর্কিত সীমান্ত, বড় বাণিজ্য ঘাটতি এবং কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মতো বিষয় এখনো ভারত-চীন সম্পর্ককে জটিল করে রেখেছে।

সি জিনপিং ও অন্যান্য বিশ্বনেতাকে স্বাগত জানাতে নয়াদিল্লির বিভিন্ন সড়কে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ছবিসংবলিত পোস্টার লাগানো হয়েছে। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কেন্দ্রীয় এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করায় সাধারণ মানুষকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ।

উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০০৯ সালে ব্রিকস গঠিত হয়। সময়ের সঙ্গে জোটটি সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমানে ১১ সদস্যের সংগঠনে পরিণত হয়েছে। ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও এর সদস্য।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিয়ে জোটের সদস্য দেশগুলোর অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে। ফলে এবারের সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

ভারতের অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষণা পরিচালক হর্ষ ভি. পান্তের মতে, এবারের ব্রিকস সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ জোটের সদস্যদের মধ্যে বড় ধরনের বিভাজনের কারণ হতে পারে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের এটি প্রথম ভারত সফর। ফলে মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে তার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আলোচনাও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ শিলান শাহ মনে করেন, ইরানকে ঘিরে সংঘাত ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের জন্য বড় পরীক্ষা। এর আগে মে মাসে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও সদস্য দেশগুলো কোনো যৌথ ঘোষণায় পৌঁছাতে পারেনি।

ভারত একদিকে ইরান ও ইসরাইল—দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও কৌশলগত সম্পর্ক ধরে রেখেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতে রাশিয়ার ওপর ভারতের নির্ভরতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ চললেও রাশিয়া ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার ও বড় জ্বালানি সরবরাহকারী।

এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভারত সফর করেছিলেন পুতিন। চলতি মাসেই কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে মোদির সঙ্গে তার বৈঠক হয়।

অন্যদিকে চলতি মাসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ সফর করেছেন। সফরকালে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুদ্ধ বন্ধে ভারতের ইতিবাচক ভূমিকার জন্য প্রকাশ্যে কৃতজ্ঞতা জানান।

সব মিলিয়ে যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন কূটনৈতিক অবস্থানের মধ্যে এবারের ব্রিকস সম্মেলনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।