আগস্টে ২৬ জেলায় ৬৭ সাংবাদিক নির্যাতন-হয়রানির শিকার

আগস্টে ২৬ জেলায় ৬৭ সাংবাদিক নির্যাতন-হয়রানির শিকার

মুক্তমন রিপোর্ট : দেশে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও হুমকির ঘটনা বেড়েছে। বেসরকারি সংস্থা মিডিয়া ইনিশিয়েটিভ ফর ডেভেলপমেন্ট (মিড)-এর সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্ট মাসে দেশের ২৬টি জেলায় ৪৪টি পৃথক ঘটনায় ৬৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা বেড়েছে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকের সংখ্যা বেড়েছে ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ

শারীরিক হামলাই বেশি

মিডের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের সবচেয়ে বেশি ঘটনা ছিল শারীরিক হামলা। মোট ঘটনার ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ ছিল শারীরিক হামলা।

এ ছাড়া সাংবাদিকদের হুমকি, হেনস্তা, হত্যার হুমকি ও অপহরণের ঘটনাও ঘটেছে। সংবাদ সংগ্রহ বা ভিডিও ধারণের সময়, বিশেষ করে রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি কাভার করতে গিয়ে বেশির ভাগ হামলার ঘটনা ঘটে।

ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ঘটনা

জেলাভিত্তিক হিসাবে আগস্টে সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে রাজধানী ঢাকায়। এখানে মোট ৯টি ঘটনা ঘটেছে।

এর মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে পাঁচ সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনাও রয়েছে।

এ ছাড়া বরিশাল, শরীয়তপুর ও সিলেটে তিনটি করে ঘটনা ঘটেছে।

অভিযুক্তদের মধ্যে স্থানীয় প্রভাবশালীর সংখ্যা বেশি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। মোট ঘটনার ২২ দশমিক ৭ শতাংশে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক দল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদল-এর নাম এসেছে প্রায় ২৭ শতাংশ ঘটনায়

এ ছাড়া চারটি ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে সাংবাদিক নির্যাতনের সরাসরি অভিযোগ পাওয়া গেছে।

রাঙামাটি ও নাটোরে আলোচিত ঘটনা

মিডের প্রতিবেদনে আগস্টের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১১ আগস্ট রাঙামাটিতে পুলিশ এক সাংবাদিককে তুলে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত ওই সাংবাদিক মুক্তি পাননি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

১২ আগস্ট নাটোরের লালপুরে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ছয় সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। এটিকে আগস্ট মাসে সাংবাদিকদের ওপর সবচেয়ে বড় দলগত হামলার ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সাতক্ষীরায় সংবাদ সংগ্রহের সময় জেলা প্রশাসকের (ডিসি) পক্ষ থেকে এক সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রায় ৩৯ শতাংশ ঘটনায় হয়নি কোনো আইনি ব্যবস্থা

সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার চিত্র নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মিড।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৩৯ শতাংশ ঘটনায় কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এসব ঘটনায় মামলা তো হয়নি, এমনকি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়নি।

মোট ঘটনার ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশে থানায় জিডি করা হয়েছে। আর আনুষ্ঠানিক মামলা হয়েছে মাত্র দুটি ঘটনায়, যা মোট ঘটনার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ

ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের এমন পরিস্থিতিকে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছে মিড।

দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত

গণমাধ্যমের ধরন অনুযায়ী আগস্টে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিকরা। তাদের হার ৫২ দশমিক ২ শতাংশ

এরপর টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিক ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় দায়িত্বশীল ভূমিকার আহ্বান

মিডিয়া ইনিশিয়েটিভ ফর ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক রাশেদুল হাসান বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি ও হয়রানির ঘটনা শুধু গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য নয়, দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্যও উদ্বেগজনক।

তিনি বলেন, সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ দ্রুত নথিভুক্ত করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।

মিডের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনা বৃদ্ধি এবং এসব ঘটনায় পর্যাপ্ত আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার প্রবণতা গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।