বিশেষ প্রতিবেদন : খাদ্য নিরাপত্তায় নতুন মাইলফলক ছুঁয়েছে বাংলাদেশ। সরকারি খাদ্যগুদাম ও সাইলোতে ধান, চাল ও গম মিলিয়ে খাদ্যশস্যের মজুদ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ টনে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ২০ লাখ টন চাল এবং বাকি অংশ গম। সরকারি গুদামে এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ খাদ্যশস্য মজুদের রেকর্ড।
খাদ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই রেকর্ড মজুদের পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ রয়েছে—আমন ও বোরোর বাম্পার ফলন, কৃষকদের কাছ থেকে ভালো দামে ধান সংগ্রহে সফলতা এবং সরকারি খাদ্যগুদামের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি।
খাদ্য বিভাগ সাধারণত সাড়ে ১৩ লাখ টন খাদ্যশস্যকে নিরাপদ মজুদের সূচক হিসেবে বিবেচনা করে। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ টন চাল ও সাড়ে তিন লাখ টন গম থাকে। বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সংকটের সময় খাদ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ওএমএস, ভিজিডি, ভিজিএফ ও কাবিখার মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য কমপক্ষে তিন মাসের খাদ্য মজুদ রাখার নীতি রয়েছে।
বর্তমান মজুদ সেই নিরাপদ মাত্রার চেয়ে প্রায় ১০ লাখ টন বেশি। ফলে দুর্যোগ মোকাবিলা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনায় সরকারের সক্ষমতা বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও সরকারি মজুদ সরকারকে বাড়তি শক্তি দিচ্ছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সংগ্রহ) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, এটি খাদ্য বিভাগের সর্বকালের সর্বোচ্চ মজুদ। গত আমন মৌসুমে ১২ লাখ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে এবং বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে ৫ লাখ টন খাদ্যশস্য। বর্তমানে বোরো সংগ্রহ কার্যক্রম চলছে। ১৮ লাখ টন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ইতোমধ্যে সাড়ে ১৩ লাখ টন খাদ্যশস্য গুদামে জমা পড়েছে।
তিনি বলেন, যৌক্তিক দামে ধান সংগ্রহ, অনুকূল আবহাওয়ায় বাম্পার উৎপাদন এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আমদানি করা খাদ্যশস্য দেশে পৌঁছানোর কারণেই সরকারি মজুদে এই রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আমন সংগ্রহ সফল হওয়ার পেছনে কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্য ও যৌক্তিক দামে ধান কেনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি ধান ও চালকল মালিকদের কাছ থেকে চুক্তিভিত্তিক চাল সংগ্রহও সরকারি মজুদ বাড়াতে সহায়তা করেছে।
তবে সরকারি গুদামে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুদ থাকলেও খোলাবাজারে চালের দাম নিয়ে স্বস্তি নেই। মোটা, মাঝারি ও সরু—সব ধরনের চালের দামই তুলনামূলকভাবে চড়া। এর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি মজুদের বড় অংশ আপৎকালীন পরিস্থিতি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য সংরক্ষিত থাকে। ফলে খোলাবাজারে চালের সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণে বেসরকারি মিলার ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব রয়েছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে দেশের বাজারে চালের দাম কেজিতে গড়ে ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৪৮-৫২ টাকা থেকে বেড়ে মাসের শেষে ৫০-৫৪ টাকায় দাঁড়ায়। মাঝারি মানের চালের দাম বেড়ে ৫২-৬৪ টাকা এবং সরু চালের দাম মানভেদে ৬৫-৭৮ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়।
পাহাড়তলী চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন বলেন, দেশে উৎপাদন ভালো এবং আমদানিও হচ্ছে। তাই চালের দাম বাড়ার যৌক্তিক কারণ নেই। বাজারে কার্যকর তদারকির ঘাটতি রয়েছে বলেই দাম বাড়ছে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত এক দশকে সরকারি খাদ্যগুদাম ও সাইলোর ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। আধুনিক স্টিল সাইলো ও নতুন লোকাল সাপ্লাই ডিপো (এলএসডি) নির্মাণের ফলে বর্তমানে সরকারি খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা প্রায় সাড়ে ২২ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের লক্ষ্য, ২০২৮ সালের মধ্যে সরকারি খাদ্যশস্য সংরক্ষণ ক্ষমতা ৩৭ লাখ টনে উন্নীত করা। বর্তমানে ধারণক্ষমতার তুলনায় কিছুটা বেশি খাদ্যশস্য মজুদ থাকলেও খামাল বা সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ২৩ লাখ টন পর্যন্ত খাদ্যশস্য রাখা সম্ভব বলে জানিয়েছে খাদ্য বিভাগ।
এর আগে ২০২৫ সালে সরকারি গুদামে সর্বোচ্চ ২২ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদের রেকর্ড ছিল। এবার সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ায় বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানির প্রয়োজন কমেছে। এতে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বন্যায় দেশের উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের কিছু নিচু এলাকার সরকারি গুদাম চত্বরে পানি উঠলেও মূল গুদামের ভেতরে পানি প্রবেশ করেনি। আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ায় মজুদ খাদ্যশস্যের বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সরকারি গুদামে মজুদ খাদ্যশস্যের একটি অংশ খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়। পাশাপাশি কাবিখাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচিতে খাদ্যশস্য ব্যবহার করা হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কাবিখা কর্মসূচির জন্য ১ লাখ ৩৫ হাজার টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ ছিল। খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়লেও বর্তমান বিপুল মজুদ থেকেই তা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।
- আগামীর সময়