দায়মিরা আক্তার : একটি ব্যঙ্গাত্মক নাম। একটি ক্ষুব্ধ প্রজন্ম। আর একটি প্রশ্ন—ক্ষমতার কাছে সাধারণ মানুষের জবাবদিহি কি সত্যিই অসম্ভব?
ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’—Cockroach Janta Party বা CJP—প্রথমে কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দল ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক পরিচয়। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সেই অনলাইন বিদ্রূপ রূপ নিয়েছে বাস্তব রাজনৈতিক আন্দোলনে। দিল্লির রাজপথে হাজারো তরুণের উপস্থিতি, শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির সংকট নিয়ে ক্ষোভ, পরীক্ষার অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি—সব মিলিয়ে ভারতের রাজনীতিতে একটি নতুন ধরনের তরুণ প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আন্দোলন কোনো পুরোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে শুরু হয়নি। এটি শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষোভ থেকে।
অপমানের শব্দ যখন প্রতিবাদের পরিচয় হয়ে ওঠে
‘ককরোচ’—অর্থাৎ তেলাপোকা—শব্দটি নিজেই একটি রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বেকার তরুণদের নিয়ে করা অবমাননাকর মন্তব্যের প্রতিবাদে তরুণেরা সেই অপমানজনক শব্দটিকেই নিজেদের পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করেছে।
এটি প্রতিবাদের একটি পুরোনো কৌশল—ক্ষমতাবান যে শব্দ দিয়ে দুর্বলকে অপমান করে, দুর্বল কখনো কখনো সেই শব্দটিকেই নিজের শক্তির প্রতীকে পরিণত করে।
CJP-এর ক্ষেত্রেও ঠিক সেটিই ঘটেছে। যে শব্দ তরুণদের অবজ্ঞা করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল বলে তারা মনে করেছে, সেই শব্দই তারা রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করেছে। এর মধ্য দিয়ে তারা যেন বলছে—‘আপনারা আমাদের যে নামে ডাকছেন, আমরা সেই নামেই আপনাদের সামনে দাঁড়াব।’
রাজনীতির ভাষায় এটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতীকী প্রতিরোধ।
অনলাইন ব্যঙ্গ থেকে বাস্তব রাজপথ
আধুনিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত এখানেই। আগে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে উঠত দলীয় সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন কিংবা দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক কাজের মাধ্যমে।
এখন একটি আন্দোলনের জন্ম হতে পারে একটি পোস্ট, একটি ভিডিও, একটি ব্যঙ্গাত্মক নাম কিংবা একটি ভাইরাল বক্তব্য থেকে।
CJP-এর উত্থান দেখিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু মতামত প্রকাশের জায়গা নয়; এটি রাজনৈতিক সংগঠনেরও একটি নতুন অবকাঠামো হয়ে উঠছে। অনলাইনে লাখো মানুষের সমর্থন পাওয়া এবং তাদের একটি অংশকে রাজপথে নিয়ে আসা—এই দুইয়ের মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য আছে। কিন্তু CJP-এর ঘটনা দেখাচ্ছে, সেই ব্যবধানও ধীরে ধীরে কমে আসছে।
এখানেই প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।
তরুণদের কাছে এখন রাজনৈতিক সংগঠন মানেই শুধু দলীয় কার্যালয়, পতাকা ও মিছিল নয়। তারা মিম, ভিডিও, ডিজিটাল প্রচারণা, ব্যঙ্গ এবং অনলাইন পরিচয়ের মাধ্যমেও রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে পারে।
প্রশ্নফাঁসের ক্ষোভ আসলে আরও গভীর
CJP-এর আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে পরীক্ষার অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁস সামনে এসেছে। কিন্তু কোনো বড় আন্দোলন সাধারণত একটি মাত্র ঘটনার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না।
পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তরুণদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভকে সামনে নিয়ে এসেছে।
একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর পড়াশোনা করে একটি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়। তার পরিবার অর্থ ব্যয় করে, সময় ব্যয় করে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন তৈরি করে। এরপর যদি প্রশ্নফাঁস বা পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তখন ক্ষতিটা শুধু একটি পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
তরুণের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়—আমি কি সত্যিই মেধা দিয়ে এগোতে পারব?
এই প্রশ্নের উত্তর যদি রাষ্ট্র দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ক্ষোভ শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে থাকে না; তা রাষ্ট্রের ওপর আস্থার সংকটে পরিণত হয়।
এ কারণেই CJP-এর আন্দোলনকে কেবল একটি পরীক্ষা বা একজন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে চাকরির সংকট, প্রতিযোগিতার চাপ, শিক্ষাব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ।
ভারতের জেন-জি কি রাজনীতির নতুন শক্তি?
ভারতের সাম্প্রতিক আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে—জেন-জি কি প্রচলিত রাজনীতির বাইরে নতুন ধরনের রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠছে?
এই প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ আগের প্রজন্মের মতো নয়। তারা কোনো দলের সদস্য না হয়েও রাজনৈতিক হতে পারে। কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের পূর্ণাঙ্গ অনুসারী না হয়েও সরকারের সমালোচনা করতে পারে। কোনো নির্বাচনে প্রার্থী না হয়েও রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি চাইতে পারে।
তাদের রাজনীতি অনেক সময় ইস্যুভিত্তিক।
আজ শিক্ষা। কাল চাকরি। পরদিন পরিবেশ। তার পরদিন নাগরিক অধিকার।
এই আন্দোলনগুলো সবসময় একই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নয়। বরং তরুণেরা অনেক সময় দলগুলোকেই সন্দেহের চোখে দেখে। তারা মনে করে, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় গেলে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন ভুলে যায়।
CJP-এর আন্দোলন তাই একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে—একটি আন্দোলন দলীয় রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে, কিন্তু নিজে প্রচলিত রাজনৈতিক দল না হয়েও।
দিল্লির রাজপথে সংঘর্ষ: রাষ্ট্রের জন্য সংকেত
সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হয়েছেন। এরপর আন্দোলনের নেতৃত্ব আরও মিছিল না করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে, যাতে তরুণ আন্দোলনকারীদের আরও ক্ষতি না হয়। কিন্তু রাজপথের মিছিল থেমে গেলেই ক্ষোভ থেমে যায় না।
বরং অনেক সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ আন্দোলনের মূল দাবিকে আরও শক্তিশালী করে।
রাষ্ট্রের সামনে তখন দুটি পথ থাকে। প্রথমটি হলো—আন্দোলনকে আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখা। দ্বিতীয়টি হলো—আন্দোলনের পেছনে থাকা সামাজিক ক্ষোভকে বোঝার চেষ্টা করা।
প্রথম পথ সাময়িকভাবে রাস্তা খালি করতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় পথই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান তৈরি করে।
যদি তরুণদের প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া হয়, তাহলে আজকের একটি আন্দোলন আগামী দিনের আরও বড় আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
ক্ষমতার সবচেয়ে বড় ভুল: তরুণদের অবমূল্যায়ন
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য আছে—ক্ষমতাসীনরা প্রথমে আন্দোলনকে গুরুত্ব দেয়নি।
তারা ভেবেছে, এটি সাময়িক ক্ষোভ। কিছু মানুষ। কিছু পোস্ট। কিছু হ্যাশট্যাগ।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি আন্দোলনের বিস্তার অনুমান করা কঠিন। একটি ঘটনা একটি শহরে ঘটতে পারে, কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো দেশে ছড়িয়ে যেতে পারে।
CJP-এর উত্থানও সেই বাস্তবতারই উদাহরণ।
একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন উদ্যোগ কীভাবে তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করতে পারে, তা প্রচলিত রাজনীতির জন্য বড় শিক্ষা।
ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষদের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—তারা বাস্তব জনমত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। চারপাশের মানুষ যদি শুধু প্রশংসা করে, তাহলে সরকার অনেক সময় বুঝতেই পারে না সাধারণ মানুষ আসলে কী ভাবছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিবাদের নতুন যুগ?
ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’কে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন, শ্রীলঙ্কার গণআন্দোলন কিংবা নেপালের তরুণদের রাজনৈতিক ক্ষোভের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না। প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা।
তবু একটি অভিন্ন প্রবণতা আছে।
তরুণেরা আর শুধু ভোটার হতে চায় না। তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশ হতে চায়।
তারা জানতে চায়—
কেন চাকরি নেই?
কেন পরীক্ষায় অনিয়ম হয়?
কেন রাজনৈতিক নেতারা জবাবদিহি করেন না?
কেন ক্ষমতাবানদের জন্য আইন একরকম আর সাধারণ মানুষের জন্য অন্যরকম?
এই প্রশ্নগুলো কোনো একটি দেশের নয়। দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশের তরুণ প্রজন্ম একই প্রশ্ন করছে।
আন্দোলনের পরের প্রশ্নটাই সবচেয়ে কঠিন
তবে গণআন্দোলনের সাফল্য শুধু সরকারকে চাপে ফেলার মধ্যে নয়। একটি আন্দোলন কতটা দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারে, সেটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
CJP-এর মতো আন্দোলনের সামনে তাই ভবিষ্যতে কয়েকটি বড় প্রশ্ন থাকবে।
তারা কি অনলাইন জনপ্রিয়তাকে দীর্ঘস্থায়ী সাংগঠনিক শক্তিতে পরিণত করতে পারবে?
তারা কি শুধু প্রতিবাদ করবে, নাকি বিকল্প নীতিও উপস্থাপন করবে?
তারা কি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করবে, নাকি প্রচলিত দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকবে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তরুণদের ক্ষোভকে কি একটি টেকসই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া সম্ভব?
ইতিহাস বলে, সরকার পতনের আন্দোলন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের আন্দোলন এক জিনিস নয়। প্রথমটি তুলনামূলকভাবে দ্রুত ঘটতে পারে। দ্বিতীয়টির জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রতিষ্ঠান, নেতৃত্ব ও নীতি।
‘ককরোচ’ আসলে একটি সতর্কবার্তা
ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ হয়তো আগামী দিনের একটি বড় রাজনৈতিক দল হবে, হয়তো হবে না। এই আন্দোলন হয়তো দীর্ঘস্থায়ী হবে, হয়তো সময়ের সঙ্গে দুর্বল হয়ে যাবে।
কিন্তু এর রাজনৈতিক গুরুত্ব এখানেই শেষ নয়।
কারণ CJP দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক তরুণেরা অপমানকে সংগঠনে পরিণত করতে পারে। ব্যঙ্গকে রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপ দিতে পারে। অনলাইন ক্ষোভকে রাজপথে নিয়ে আসতে পারে।
এটি শুধু ভারতের জন্য নয়, দক্ষিণ এশিয়ার সব সরকারের জন্যই একটি সতর্কবার্তা।
তরুণদের অবজ্ঞা করা যায়। কিন্তু তাদের ক্ষোভকে চিরকাল উপেক্ষা করা যায় না।
যে প্রজন্মকে কেউ কেউ ‘অপ্রয়োজনীয়’, ‘বেকার’ কিংবা ‘ককরোচ’ বলে তুচ্ছ করতে পারে, সেই প্রজন্মই একদিন রাজপথে দাঁড়িয়ে ক্ষমতার কাছে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি করতে পারে—
‘আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আপনাদের কে দিয়েছে?’
সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়ার নতুন রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখন এটাই।
আর সেই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কোনো সরকারেরই নেই।