মুক্তমন রিপোর্ট: বাংলাদেশ উন্নয়নের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু প্রবৃদ্ধির হার বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। এখন প্রয়োজন উন্নয়নের গুণগত মান নিশ্চিত করা। একটি দেশ কত দ্রুত এগোবে, কতটা প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলবে এবং কতটা টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করবে—তা অনেকাংশেই নির্ভর করে উৎপাদনশীলতার ওপর।
একটি সমাজ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র তার সময়, শ্রম, পুঁজি ও সম্পদ ব্যবহার করে কতটা কার্যকর ফলাফল অর্জন করতে পারছে—উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি হওয়া উচিত সেটিই।
আমাদের সমাজে কর্মমূল্যায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে। অনেক সময় একজন মানুষের অবদানকে তার কর্মঘণ্টা, চাকরির মেয়াদ, পদমর্যাদা কিংবা প্রতিষ্ঠানে কাটানো সময় দিয়ে বিচার করা হয়। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে এই ধারণা ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। কারণ উন্নয়ন নির্ভর করে শুধু কে কত সময় ব্যয় করেছে তার ওপর নয়; বরং সেই সময়ে কে কতটা কার্যকর ফলাফল দিতে পেরেছে, তার ওপর।
ধর্মীয় সাহিত্যেও কর্মের ফলপ্রসূতার গুরুত্বের ইঙ্গিত রয়েছে। বাইবেলের মথি রচিত সুসমাচারের ২০ অধ্যায়ে দ্রাক্ষাক্ষেত্রের শ্রমিকদের একটি দৃষ্টান্তে দিনের বিভিন্ন সময়ে কাজে যোগ দেওয়া শ্রমিকদের সমান পারিশ্রমিক দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর ধর্মীয় ব্যাখ্যা ভিন্ন হলেও সামাজিক শিক্ষার দিক থেকে এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের অবদানকে শুধু সময়ের দৈর্ঘ্য দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদনশীলতার ঘাটতি। আমরা অনেক সময় ব্যয় করি, অসংখ্য সভা-সেমিনার করি, পরিকল্পনা গ্রহণ করি; কিন্তু প্রত্যাশিত ফলাফল সবসময় অর্জিত হয় না। অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় না, ব্যয় বেড়ে যায় এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের গতি কমে যায়।
একটি প্রকল্প তিন বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও যদি সাত বছর লাগে, তাহলে শুধু অর্থের অপচয় হয় না—জনগণও দীর্ঘ সময় কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। একইভাবে যে সরকারি সেবা কয়েক ঘণ্টায় দেওয়া সম্ভব, তা যদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কয়েক সপ্তাহ সময় নেয়, সেটিও রাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতার দুর্বলতার প্রতিফলন।
উৎপাদনশীলতার প্রশ্ন শুধু অর্থনীতি বা প্রশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি ও সামাজিক উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর গুরুত্ব রয়েছে।
শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করছে, বিপুল অর্থ ব্যয় করছে এবং অসংখ্য পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। কিন্তু কর্মজীবনে প্রবেশের পর অনেকেই বাস্তব দক্ষতার ঘাটতিতে পড়ছে। এর অন্যতম কারণ মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।
আধুনিক কর্মবাজারে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু সনদ প্রদান নয়; বরং দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদ তৈরি করা।
বাংলাদেশ কৃষিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষিকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। উন্নত বীজ, যান্ত্রিকীকরণ, সেচব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শিল্প খাতেও শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দক্ষ শ্রমশক্তি, আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প। ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নেতৃত্ব তাদের হাতেই থাকবে, যারা জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে এগিয়ে যেতে পারবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি।
জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার ওপর ভর করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া কয়েক দশকের মধ্যে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্প ও প্রযুক্তিশক্তিতে পরিণত হয়েছে। সিঙ্গাপুর সীমিত ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সুশাসন, দক্ষ মানবসম্পদ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। বড় জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল জনশক্তিতে রূপান্তর, শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং কর্মসংস্কৃতির ওপর গুরুত্ব দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করেছে।
বাংলাদেশের অন্যতম বড় সম্পদ হলো তার জনগণ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম। এই জনশক্তিকে দক্ষ, উদ্ভাবনী ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করা গেলে আগামী কয়েক দশকে দেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
কিন্তু বিপুল সংখ্যক তরুণ যদি বেকার, অদক্ষ কিংবা কর্মবিমুখ হয়ে পড়ে, তাহলে জনসংখ্যার সম্ভাবনাই অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হতে পারে। তাই দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
আমাদের জাতীয় জীবনের আরেকটি সমস্যা হলো অজুহাতের সংস্কৃতি। অনেক সময় আমরা সমস্যার কারণ ব্যাখ্যা করতে যতটা আগ্রহী, সমাধান বাস্তবায়নে ততটা নই। অথচ উন্নত দেশগুলো সংকটকে শুধু বাধা হিসেবে দেখেনি; বরং সংকটকে নতুন সুযোগ তৈরির ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে প্রতিযোগিতা মূলত উৎপাদনশীলতার প্রতিযোগিতা। দক্ষ মানবসম্পদ, জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন এখন অর্থনৈতিক শক্তির প্রধান ভিত্তি। সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করাই আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
বাংলাদেশকে উন্নত, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাবান রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় উৎপাদনশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে যুগোপযোগী করতে হবে এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে হবে।
একই সঙ্গে উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে এমন একটি কর্মসংস্কৃতি, যেখানে শুধু কত ঘণ্টা কাজ করা হয়েছে তা নয়, বরং সেই কাজ থেকে কী ফলাফল এসেছে—তা বেশি গুরুত্ব পাবে।
জাতীয় সমৃদ্ধি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফল নয়; এটি একটি মানসিকতা, কর্মসংস্কৃতি ও সামাজিক অঙ্গীকারের ফল। সেই অঙ্গীকারের কেন্দ্রে থাকতে হবে উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা, জবাবদিহিতা ও ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন।
আজ সময় এসেছে নতুন করে ভাবার। আমরা কতক্ষণ কাজ করেছি, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমরা কী অর্জন করেছি। আমরা কত বছর কোনো পদে ছিলাম, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেই সময়ে কী পরিবর্তন এনেছি। আমরা কত পরিকল্পনা করেছি, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কতটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছি।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির প্রশ্ন তাই শুধু ‘কত ঘণ্টা কাজ করেছি’ নয়—বরং ‘কতটা উৎপাদনশীল হতে পেরেছি’।