মুহাম্মদ মোতাহার হোসাইন : আমি ঠিক জানিনা এই লেখাটা আমার জন্যে কতটুকু নিরাপদ। তবে ব্যবসায়িক মাফিয়া তন্ত্রের যে ভয়ংকর থাবার মুখে আমার দেশ ও দেশের মানুষ পড়তে যাচ্ছে তা জানানোর জন্যে এই লেখাটা গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৬ সালের ১৫ জুন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের পানগাঁওয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (বিওজিসিএল) দেশের প্রথম বেসরকারি বিটুমিন প্ল্যান্ট স্থাপনের অনুমতি পায়।
সে সময় প্রচার করা হয়েছিল, বিদেশ থেকে আমদানিকৃত বিটুমিন নিম্নমানের এবং দেশের আবহাওয়ার উপযোগী নয়।
তাই দেশীয় টাকা সাশ্রয় ও টেকসই সড়ক নির্মাণে স্থানীয় শিল্পের বিকাশে ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এই প্ল্যান্টের বাণিজ্যিক উদ্বোধন করা হয়।
প্ল্যান্ট চালু করার পরপরই বসুন্ধরা বুঝতে পারে যে মুক্ত বাজারে মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তারা বেশি মুনাফা করতে পারবে না, কারণ আমদানিকৃত বিটুমিনের দাম ছিল তুলনামূলক কম।
সেই স্বার্থে দেশীয় শিল্পের 'সুরক্ষা' দোহাই দিয়ে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকে (BTTC) ব্যবহার করে তৎকালীন সরকার আমদানিকৃত বিটুমিনের ওপর ড্রামের ক্ষেত্রে ৪৭% এবং বাল্কের ক্ষেত্রে ৩৭% অতিরিক্ত শুল্ক ও কর আরোপ করে।
এর সাথে আমদানিকৃত প্রতিটি বিটুমিন চালানের মান বুয়েট বা ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে বাধ্যতামূলক পরীক্ষার নতুন নিয়ম করা হয়।
অত্যাধিক শুল্ক এবং ল্যাব টেস্টের দীর্ঘসূত্রতার কারণে বেসরকারি আমদানিকারকদের খরচ ও জটিলতা আকাশচুম্বী হয়ে যায়। প্রতিযোগীরা বাজার থেকে ছিটকে পড়তে শুরু করলে বসুন্ধরা তাদের বিটুমিনের দাম বাড়িয়ে দেয়।
ফলে টন প্রতি ৩৯,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫৬,০০০-৫৯,০০০ টাকা হয়ে নির্মাণ ব্যয় ১৫%-৩০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
এভাবেই দেশের বিটুমিনের চাহিদার ৭০% এর বেশি বসুন্ধরার হাতে তুলে দেয়া হয়।
ক্রুড অয়েল থেকে বিটুমিন তৈরির সময় বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে ন্যাপথা, ফার্নেস অয়েল এবং উচ্চমানের ডিজেল উৎপাদিত হয়।
আইনের মূল বিধান অনুযায়ী, এই সমস্ত জ্বালানি তেল কেবল রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিপিসির কাছে সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করার কথা।
কিন্তু বসুন্ধরা গ্রুপ ২০২১ সালের মার্চ মাসে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে আবেদন করে যে, তারা এই বাই-প্রোডাক্ট সরাসরি খোলা বাজারে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করবে।
বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা বুঝে ২০২১ সালের আগস্টে জ্বালানি বিভাগ সরাসরি জানিয়ে দেয়, আইন অনুযায়ী বিপিসি ছাড়া অন্য কারও স্থানীয় বাজারে তেল আমদানির বা সরাসরি বিতরণের আইনি অধিকার নেই।
সরকারি আমলারা আইন মেনে বাধা দিলেও বসুন্ধরা তাদের রাজনৈতিক লবিং জোরদার করে।
২০২২ সালের ৩১ মার্চ তারা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা তৌফিক–ই–ইলাহী চৌধুরীর কাছে সরাসরি আবেদন করে।
উপদেষ্টার অফিস থেকে চাপ আসার পর ওই বছরের জুনে জ্বালানি বিভাগ পুনরায় বিপিসির মতামত চায়। এবার আমলারা সুর নরম, "সীমিত পরিসরে" বেসরকারি খাতকে এই বিপণনের সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন।
বসুন্ধরাকে এই বিশেষ সুবিধা দিতে ২০২৩ সালের নভেম্বরে সরকার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নীতিমালায় বড় সংশোধন আনে।
২০২৪ সালের জুন মাসে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ চূড়ান্ত যে নীতিমালা জারি করে, সেখানে বলা হয় কোনো বেসরকারি রিফাইনারি বা প্ল্যান্ট প্রথম ৩ বছর তাদের উৎপাদিত জ্বালানির ৪০% সরাসরি নিজস্ব ডিস্ট্রিবিউশন চেইনের মাধ্যমে খোলা বাজারে বিক্রি করতে পারবে। বাকি ৬০% বিপিসির কাছে বিক্রি করবে।
এই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বসুন্ধরা তাদের বিটুমিন প্ল্যান্টের বাই-প্রোডাক্ট ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল সরাসরি পাম্প ও শিল্প-কারখানায় বিক্রির আইনি বৈধতা পেয়ে যায়।
বাই-প্রোডাক্ট বা উপজাত বিক্রির সফলতার পর বসুন্ধরার ক্ষুধা আরও বেড়ে যায়। তারা শুধু নিজেদের প্ল্যান্টের উপজাত তেল বিক্রিতেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বিদেশ থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বাজারজাতকরণের জন্য বড় ধরনের মুভ নেয়।
দেশে যেখানে বাৎসরিক ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৫০ লাখ টন, সেখানে একটা বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে এর বিশাল অংশের আমদানি একচেটিয়াভাবে তুলে দেয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে।
এর আগে এলপি গ্যাস (সিলিন্ডার গ্যাস) খাতকে পুরোপুরি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পর বড় করপোরেট কোম্পানিগুলোর সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে প্রতি মাসে দাম বাড়তে থাকে। একদিকে খনির গ্যাস গৃহস্থালিতে বন্ধ অন্যদিকে এলপিজি বেসরকারী কোম্পানির কবলে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC) দাম বেঁধে দিলেও বেসরকারি কোম্পানিগুলো তা তোয়াক্কা করে না। মূলধারার জ্বালানি (ডিজেল-পেট্রোল) তাদের হাতে গেলেও ঠিক একই দশা হবে।
এই অনুমোদন দেয়া হলে যাস্ট একটা ভয়াবহ ভবিষ্যতের সম্ভাবনা বলি।
যেকোনো যুদ্ধের সময় বা বৈশ্বিক সংকটে বেসরকারি কোম্পানি কখনোই লস দিয়ে তেল আনবে না। ফলে পুরো পরিবহন ও কৃষি খাত (সেচ পাম্প) স্থবির হয়ে পড়ার মাধ্যমে দেশে এক দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হবে।
একটা কোম্পানিই পুরো দেশ অচল করে দিবে। তারেক রহমানের চেয়ার তখন ওদের ইশারায় নড়বে।
যে কোম্পানি তাদের পত্রিকায় টানা ৮ বছর তারেক রহমানের সাজার নিউজ পিনড করে রেখেছিল সেই কোম্পানির হাতেই তারেক রহমানের ক্ষমতার চাবি তুলে দেয়ার সকল আয়োজন সম্পন্ন করা হচ্ছে।
(লেখাটি ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া। এর সঙ্গে মুক্তমনের সম্পদকীয় নীতির অংশ নয়, একান্তই লেখকের ব্যক্তিগত।)