গণমাধ্যমে জমিদারি মানসিকতা: স্বাধীন সাংবাদিকতার বড় সংকট

Screenshot 2026-05-18 093814
Screenshot 2026-05-18 093814

সৈয়দ আখতার সিরাজী : ​সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা খর্ব করে, চাকরিকে জিম্মি করে এবং ছাড়পত্র সংস্কৃতি চালু করে কোনো সভ্য গণমাধ্যমব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে না,এই অমোঘ সত্যটিকে সামনে রেখেই আজ আমাদের গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ দাসত্ব ও করপোরেট সামন্তবাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সময় এসেছে। মালিকপক্ষের জমিদারি ও সামন্তবাদী মানসিকতার বিরুদ্ধে এটি কেবল কোনো সাধারণ ক্ষোভ নয়, বরং এটি এক পেশাগত প্রতিবাদ।

দুঃখজনক হলেও পরম সত্য এই যে, আজকের রূঢ় বাস্তবতা প্রমাণ করছে সেই পুরোনো জমিদারী মানসিকতা এখনো গণমাধ্যম সেক্টরে পুরোপুরি বহাল রয়েছে, যা কেবল যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নিজের বাহ্যিক রূপ বদলেছে। অতীতে জমিদাররা যেভাবে প্রজাদের ভাগ্য নির্ধারণ করত, বর্তমানের কিছু গণমাধ্যম মালিক ঠিক একইভাবে সাংবাদিকদের পেশাগত জীবন, সততা ও রুটি-রুজিকে নিজেদের পকেটে বন্দি করে রাখতে চাচ্ছেন।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে গণমাধ্যমকে বলা হয় গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ, কিন্তু যখন সেই স্তম্ভের কারিগরদেরই প্রতিনিয়ত চাকরি হারানোর ভয়ে তটস্থ থাকতে হয়, তখন সামগ্রিক গণমাধ্যম ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটিই উন্মোচিত হয়। ছাড়পত্র বা অনাপত্তিপত্র নামক যে আধুনিক শৃঙ্খল সাংবাদিকদের গলায় পরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা মূলত মুক্ত সাংবাদিকতার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার শামিল।

কোনো সাংবাদিক যদি একটি প্রতিষ্ঠান ছেড়ে অন্য কোথাও তার মেধা ও শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন পেতে চান, তবে তাকে পূর্ববর্তী মালিকের করুণার পাত্র হতে হয়, যা একজন পেশাদারের আত্মমর্যাদাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। এই ছাড়পত্র সংস্কৃতি আসলে সাংবাদিকদের দাস বানিয়ে রাখার এবং তাদের কণ্ঠকে আজীবনের জন্য রুদ্ধ করে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত করপোরেট চক্রান্ত।

এর ফলে সাংবাদিকরা সত্য লিখতে ভয় পান, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কলম ধরতে দ্বিধাবোধ করেন, কারণ তারা জানেন যে সামান্যতম বিচ্যুতি বা মালিকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গেলে তাদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়া হবে। চাকরিকে জিম্মি করার এই নোংরা খেলা কেবল একজন ব্যক্তির রুটি-রুজির ওপর আঘাত নয়, বরং এটি জনগণের তথ্য পাওয়ার মৌলিক অধিকারের ওপর এক বড় ধরনের চপেটাঘাত।

সামন্তবাদী যুগে জমিদাররা যেভাবে লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে এলাকা শাসন করত, আজকের দিনে কিছু গণমাধ্যম মালিক কর্পোরেট পলিসি এবং ছাঁটাইয়ের আইনি মারপ্যাঁচ ব্যবহার করে সাংবাদিকদের ওপর মানসিক ও পেশাগত নির্যাতন চালাচ্ছেন। সম্পাদকীয় স্বাধীনতা আজ ডুমুরের ফুল হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কাগজের নীতি বা চ্যানেলের সম্পাদকীয় পলিসি নির্ধারিত হয় মালিকের ব্যবসায়িক স্বার্থ ও রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে।

সাংবাদিকরা আজ কেবল তথ্যের সংগ্রাহক নন, বরং তারা যেন মালিকদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে বাধ্য হচ্ছেন। এই করুণ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যে একতা এবং এই করপোরেট জমিদারির বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী পেশাগত আন্দোলন গড়ে তোলা ব্যতিরেকে কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।

যদি আজ আমরা এই দাসত্বের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার না হতে পারি, তবে আগামী দিনের গণমাধ্যম কেবলই তোষামোদি আর চাটুকারিতার এক বিশাল কারখানায় পরিণত হবে, যেখানে সত্যের কোনো স্থান থাকবে না। পেশাগত মর্যাদা, চাকরির নিরাপত্তা এবং মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এই সামন্তবাদী মানসিকতার মূলোৎপাটন করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

এই আধুনিক দাসপ্রথার শেকল ভেঙে ফেলার জন্য সাংবাদিকদের মেধা ও যোগ্যতার পাশাপাশি তীব্র আত্মসম্মানবোধের জাগরণ প্রয়োজন, কারণ সাংবাদিকতা কোনো করুণার চাকরি নয়, এটি একটি মহান ব্রত। যখন কোনো রাষ্ট্র বা সমাজে সাংবাদিকদের সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাদের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বন্দি করে রাখা হয়, তখন সেই সমাজের সামগ্রিক পচন রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

করপোরেট সংস্কৃতির নামে যে শোষণ প্রক্রিয়া চলছে, তার অবসান ঘটাতে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্দিষ্ট শ্রম আইন ও সাংবাদিকদের জন্য সঠিক বেতন কাঠামোর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। মালিকপক্ষের খেয়ালখুশিমতো নিয়োগ ও অব্যাহতির যে ধারা তৈরি হয়েছে, তা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বন্ধ না করা গেলে গণমাধ্যম কেবল পুঁজিপতিদের ব্যক্তিগত হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হতে থাকবে।

তাই এই অশুভ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কলমযোদ্ধাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গায় একযোগে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে, যেন আগামী প্রজন্ম একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং মর্যাদাপূর্ণ সাংবাদিকতার পরিবেশ ফিরে পায়।

লেখক : সাংবাদিক, (লেখাটি লেখকের একান্ত নিজস্ব মত। এর সঙ্গে মুক্তমনের সম্পাদকীয় নীতি সম্পৃক্ত নয়।)

#Bangladesh media#corporate media control#editorial freedom#freedom of speech#independent journalism#journalism crisis#journalist rights#media corruption#media ethics#media ownership#newsroom crisis#press freedom#কর্পোরেট শোষণ#কর্পোরেট সংস্কৃতি#কর্পোরেট সামন্তবাদ#কলমযোদ্ধা#গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ#গণমাধ্যম সংকট#গণমাধ্যম সংস্কার#গণমাধ্যমে দাসত্ব#গণমাধ্যমের স্বাধীনতা#পেশাগত মর্যাদা#পেশাগত স্বাধীনতা#মতপ্রকাশের স্বাধীনতা#মিডিয়া আন্দোলন#মিডিয়া করপোরেটাইজেশন#মিডিয়া পলিসি#মিডিয়া মালিকদের আধিপত্য#মিডিয়া শোষণ#মুক্ত সাংবাদিকতা#মুক্তমন অনলাইন#শ্রম আইন#সংবাদপত্র মালিকপক্ষ#সংবাদপত্র শিল্প#সংবাদমাধ্যমের সংকট#সম্পাদকীয় স্বাধীনতা#সাংবাদিক আন্দোলন#সাংবাদিক ঐক্য#সাংবাদিক চাকরির নিরাপত্তা#সাংবাদিক নির্যাতন#সাংবাদিক সমাজ#সাংবাদিকতা#সাংবাদিকদের অধিকার#সাংবাদিকদের আত্মমর্যাদা#সাংবাদিকদের বেতন কাঠামো#স্বাধীন গণমাধ্যম