মুক্তমন রিপোর্টার : নরওয়ের রাজা হারাল্ড পঞ্চম মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দেশটির রাজপ্রাসাদ এক বিবৃতিতে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। তাঁর মৃত্যুর পর ৫৩ বছর বয়সী ছেলে ক্রাউন প্রিন্স হাকন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নরওয়ের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
রাজপ্রাসাদের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘গভীর দুঃখের সঙ্গে জানানো যাচ্ছে যে, মহামান্য রাজা হারাল্ড আজ মারা গেছেন। ২৮ আগস্ট শুক্রবার সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় ৪টা ৩৫ মিনিট) অসলো বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।’
রাজা হারাল্ডের মৃত্যুর পর রাজধানী অসলোতে রাজপ্রাসাদের পতাকা অর্ধনমিত করা হয়েছে। তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে শুক্রবারও রাজপ্রাসাদের সামনে ভিড় করেন সাধারণ মানুষ। অনেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান এবং প্রিয় রাজাকে হারানোর শোকে সেখানে জড়ো হন।
ইউরোপের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ক্ষমতাসীন রাজা ছিলেন হারাল্ড। রক্তের লোহিত কণিকা অস্বাভাবিক দ্রুত ধ্বংস হওয়ার কারণে সৃষ্ট হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ১৭ আগস্ট থেকে অসলো বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। এ রোগের কারণে সাধারণত অতিরিক্ত ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে।
বৃহস্পতিবার রাজপ্রাসাদ জানিয়েছিল, তাঁর শারীরিক অবস্থা ‘অত্যন্ত সংকটজনক’। এরপর স্ত্রী রানি সোনিয়া, ছেলে হাকন, পুত্রবধূ মেটে-মারিট এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা হাসপাতালে তাঁর পাশে ছিলেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্রাউন প্রিন্স হাকন রাতভর বাবার পাশে ছিলেন।
রাজা হারাল্ডের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন সাধারণ মানুষও। ২৪ বছর বয়সী কাসপারা বলস্টাড বলেন, হারাল্ড ছিলেন ‘অত্যন্ত স্থির ও উষ্ণ হৃদয়ের একজন রাজা’। তাঁর মতে, নরওয়ের মানুষের কাছে তিনি একজন আদর্শ এবং মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রতীক ছিলেন।
২৭ বছর বয়সী ম্যাগনুস স্কাগসেথ বলেন, হারাল্ড ছিলেন অন্তর্ভুক্তিমূলক মূল্যবোধের একজন প্রবক্তা। বিভাজন ও মেরুকরণের সময়ে তিনি সমাজকে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার মতো একটি দৃঢ় প্রতীক হয়ে ছিলেন।
১৯৯১ সালে নরওয়ের সিংহাসনে বসেন রাজা হারাল্ড। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকবার অসুস্থ হয়েছেন তিনি। হৃদযন্ত্রের সমস্যার কারণে তাঁর শরীরে পেসমেকারও স্থাপন করা হয়েছিল। শারীরিক কারণে সাম্প্রতিক সময়ে রাজকীয় দায়িত্ব ও আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিও কমিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
তবে কখনো সিংহাসন ছাড়ার কথা ভাবেননি হারাল্ড। নরওয়ের পার্লামেন্টের সামনে আজীবন দায়িত্ব পালনের যে শপথ নিয়েছিলেন, সেটিই সিংহাসনে থাকার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করতেন তিনি।
রাজা হারাল্ডের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোর বৃহস্পতিবার জার্মানি সফর বাতিল করেন।
গত এক বছর নরওয়ের রাজপরিবারের জন্য বেশ কঠিন সময় গেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্যক্তিগত সফরে স্ত্রী রানি সোনিয়াকে নিয়ে টেনেরিফে থাকা অবস্থায় সংক্রমণ ও পানিশূন্যতায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন রাজা হারাল্ড।
রানি সোনিয়াও মে মাসে হৃদযন্ত্রের সমস্যার কারণে স্বল্প সময়ের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হন।
এদিকে ক্রাউন প্রিন্স হাকনের স্ত্রী মেটে-মারিটও বিভিন্ন কারণে আলোচনায় রয়েছেন। প্রয়াত মার্কিন অর্থপাচারকারী ও যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত নথিতে ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে তাঁদের নিয়মিত এবং কিছু ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের তথ্য উঠে আসে। সে সময় এপস্টেইন ইতোমধ্যে অপরাধের দায়ে দণ্ডিত ছিলেন।
অন্যদিকে হাকনের স্ত্রী মেটে-মারিটের আগের সম্পর্কের ছেলে মারিয়ুস বর্গ হইবিও আইনি জটিলতার কারণে আলোচনায় রয়েছেন। চলতি বছরের জুনে দুই ধর্ষণসহ ৩২টি অভিযোগে তাঁকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছেন।
ফুসফুসের গুরুতর রোগে আক্রান্ত মেটে-মারিটের জুলাইয়ে ফুসফুস প্রতিস্থাপনও করা হয়।
এসব নানা বিতর্ক ও সংকটের মধ্যেও নরওয়ের রাজপরিবারের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন রয়েছে। বিশেষ করে রাজা হারাল্ডের সহজ-সরল জীবনযাপন, বিনয়ী আচরণ এবং মানুষকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ভূমিকার কারণে তিনি দেশটির মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় ছিলেন।