মুক্তমন রিপোর্ট : নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের কয়েক দিন পরও নিখোঁজ হাজারো মানুষ। দুই দেশের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজারে পৌঁছেছে। এখন পর্যন্ত ৬৮২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ভারতের নদীতেও নেপালের বন্যায় ভেসে যাওয়া কিছু মরদেহ পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) রাতে নেপালের সেনাবাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি টানেলে শ্রমিকরা আটকা পড়ে থাকতে পারেন—এমন আশঙ্কায় উদ্ধারকারীরা সেখানে একটি পাইপ প্রবেশ করাতে সক্ষম হয়েছেন।
নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুঙ জানিয়েছেন, ছোট একটি পথ দিয়ে ইতোমধ্যে টানেলের ভেতরে বাতাস পাঠানো শুরু হয়েছে। এরপর সেখানে খননকাজ শুরু করে উদ্ধারকারী দল প্রবেশ করানো হবে।
ত্রিশুলি-৩এ ও ৩বি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন টানেলে এখনো শতাধিক শ্রমিক জীবিত অবস্থায় আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে।
হিমবাহ ধস থেকেই ভয়াবহ বন্যা
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তে যে ভয়াবহ পানির স্রোত নেমে আসে, তার পেছনে ছিল একটি হিমবাহ ধস।
হিমবাহ ধসের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।
জাতিসংঘের জলবায়ুপ্রধান সাইমন স্টিল বলেন, আকস্মিক হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যা পাহাড়ি পরিবেশের ভঙ্গুরতার ভয়াবহ স্মারক। উষ্ণায়ন এ ধরনের দুর্যোগকে আরও ঘন ঘন ও ভয়াবহ করে তুলছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
‘কিছুই অবশিষ্ট নেই’
বন্যার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে নেপালের নুয়াকোট জেলার বাসিন্দা বুদ্ধি রাম দাঙ্গোল বলেন, নদীর কাছাকাছি থাকা সব বসতি ভেসে গেছে। সেখানে এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
বিডুর একটি সেনাঘাঁটিতে উদ্ধার তৎপরতার কেন্দ্রে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে ভিড় করছেন স্বজনরা। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় নিজেদের প্রিয়জনের নাম খুঁজছেন তারা।
কালকা শারদা নামের এক ব্যক্তি তার ১৮ বছর বয়সী ছেলে বিনোদ শারদাকে খুঁজছেন। বিনোদ একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।
নিখোঁজদের মধ্যে শত শত বিদেশি
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তালিকায় নিখোঁজদের মধ্যে ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের শ্রমিক এবং ৫১৭ জন বিদেশি রয়েছেন। বিদেশিদের মধ্যে ট্রেকার ও তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
ভারতের আধ্যাত্মিক সংগঠন ইশা ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, তাদের ৮০ সদস্যের একটি দল ওই অঞ্চলে ভ্রমণে ছিল। দলটি চীন সীমান্তের গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত গিরং বন্দরে অবস্থান করছিল। ফাউন্ডেশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই এলাকা প্রায় পুরোপুরি বন্যায় ভেসে গেছে।
তিব্বতে উদ্ধার অভিযান সাময়িক স্থগিত
চীনের তিব্বতের গিরং এলাকায় নতুন করে তৈরি হওয়া একটি হ্রদ থেকে আরও বন্যার আশঙ্কায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল।
তবে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, হ্রদটি প্রাকৃতিকভাবে পানি ছাড়তে শুরু করেছে এবং প্রায় পুরোপুরি পানি নেমে গেছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, গিরং এলাকায় ২ হাজার ১৪১ জন উদ্ধারকর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় রয়েছেন ৫০০ জনের বেশি উদ্ধারকর্মী।
নেপালে নিহত ৬৭৫, তিব্বতে ৭
শনিবার নেপাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৬৭৫ জন নিহত হয়েছেন। আরও ২ হাজার ৪২৬ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে তিব্বতে চীনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৭ জন নিহত এবং ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তিব্বত থেকে ৫৫৫ জন আটকে পড়া পর্যটক এবং ৪৯৯ জন চীনা বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ভারতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নেপাল থেকে প্রবাহিত নদীগুলো থেকে সাতটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলো বন্যায় ভেসে আসা মানুষের মরদেহ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুনর্গঠনে লাগতে পারে বিলিয়ন ডলার
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর পুনর্গঠনে কয়েক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
তবে এই মুহূর্তে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার উদ্ধার অভিযান এবং যত বেশি সম্ভব মানুষের জীবন রক্ষা করা। আটকে পড়াদের শনাক্ত করতে ভারী সরঞ্জাম বহনে সক্ষম ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা চেয়েছে নেপাল।
মরদেহ শনাক্তের জন্য ফরেনসিক পরীক্ষার কিট এবং মরদেহ সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজার ইউনিটের প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
নেপালকে যুক্তরাষ্ট্রের ৩.৬ মিলিয়ন ডলার সহায়তা
দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালকে ৩৬ লাখ মার্কিন ডলার মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে জরুরি খাদ্য সহায়তাও রয়েছে। দুর্যোগের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র আরও পাঁচ লাখ ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
এদিকে নেপাল ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা শনিবার কথা বলেছেন। দুই দেশ স্যাটেলাইট ও জলবিদ্যাগত তথ্য বিনিময়ের বিষয়ে আলোচনা করেছে, যাতে উদ্ধার ও দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রম আরও কার্যকর করা যায়।
ভয়াবহ এই দুর্যোগে হাজারো পরিবারের স্বজন নিখোঁজ থাকায় হিমালয় অঞ্চলে উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি অপেক্ষা বাড়ছে অনিশ্চিত পরিণতির।