অনলাইন ডেস্ক : নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিখোঁজদের উদ্ধারে অবশেষে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। বিশেষ করে হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্পের টানেলে আটকে পড়াদের উদ্ধার, মরদেহ শনাক্তকরণ এবং ডিএনএ পরীক্ষায় সীমিত পরিসরে আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়া হবে।
এর আগে বুধবার নেপাল সরকার জানিয়েছিল, দেশের নিজস্ব উদ্ধারকারী দলই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম এবং বিদেশি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক চাপের পর এক দিনের মধ্যেই সেই অবস্থান পরিবর্তন করা হয়।
নেপালের একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা দ্য কাঠমান্ডু পোস্টকে জানিয়েছেন, বিভিন্ন দেশের নাগরিক নিখোঁজ থাকায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে বিদেশি উদ্ধারকারী ও বিশেষজ্ঞ দলকে কাজে যুক্ত করার জন্য ব্যাপক চাপ ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সীমিতসংখ্যক বিদেশি বিশেষজ্ঞকে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বুধবারের আকস্মিক বন্যায় ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুক্রবার পর্যন্ত এ দুর্যোগে ৫৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৯৭৭ জন। তাঁদের মধ্যে ৩১টি দেশের ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতের নাগরিক—১৭৮ জন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫, ইউক্রেনের ৫৩, অস্ট্রেলিয়ার ৩৫ এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
চার দেশকে বিশেষজ্ঞ পাঠানোর অনুমতি
ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট সেন্টারের মূল্যায়নের ভিত্তিতে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় কমিটি ভারত, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াকে বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি দল পাঠানোর অনুমতি দিয়েছে।
এসব দলের সদস্যদের মূলত টানেলের ভেতরে আটকে পড়া মানুষ উদ্ধারে এবং ডিএনএ পরীক্ষা ও ফরেনসিক শনাক্তকরণে সহায়তা করার কথা রয়েছে।
নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অন্যান্য কয়েকটি দেশও ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি উদ্ধারকারী ও বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর আগ্রহ জানিয়েছে। তবে তাদের সবাইকে এখনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।
কাঠমান্ডুতে নিযুক্ত অন্তত দুটি দেশের কূটনৈতিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁদের দেশের নাগরিকেরা নিখোঁজ থাকায় উদ্ধার অভিযানে সহায়তার জন্য দল পাঠানোর অনুরোধ করা হলেও এখন পর্যন্ত ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
একটি দেশের দূতাবাসের এক কর্মকর্তা বলেন, নিখোঁজ নাগরিকদের সন্ধানে তিন দিনেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় তাঁরা উদ্বিগ্ন। তবে সহায়তার প্রস্তাব এখনো গ্রহণ করা হয়নি।
ভারতের বিশেষ সহায়তার প্রস্তাব
নেপালের উদ্ধার অভিযানে ভারত একটি টানেল উদ্ধারকারী দল, মেডিকেল টিম এবং ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্সের সদস্য পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শুক্রবার এ তথ্য জানান। একই দিন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালের সঙ্গে দুর্যোগ পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জয়শঙ্কর জানান, ভারত নেপালকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে এবং নেপাল সরকার সেগুলো মূল্যায়ন করছে।
তিনি আরও জানান, নেপালে পাঠানো চতুর্থ দফার ত্রাণসামগ্রীর সঙ্গে ১১ সদস্যের চিকিৎসক, প্যারামেডিক ও টানেল উদ্ধারকারী দলও রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ারও উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তুতি
দক্ষিণ কোরিয়াও নেপালে উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালের সঙ্গে কথা বলেন।
নেপালে থাকা দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি দুর্যোগস্থলে পাঠানো দেশটির প্রম্পট রেসপন্স টিমকে নির্বিঘ্নে কাজ করার জন্য নেপাল সরকারের সহযোগিতা চান তিনি।
চো হিউন জানান, প্রয়োজনে কোরিয়া ডিজাস্টার রিলিফ টিম (কেডিআরটি) দ্রুত নেপালে পাঠানোর প্রস্তুতিও চলছে।
হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্পের টানেলে নিখোঁজ বহু মানুষ
নেপাল সরকার জানিয়েছে, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হবে রসুয়া ও নুয়াকোট জেলার বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে উদ্ধার অভিযান।
বন্যায় রসুয়ায় আটটি এবং নুয়াকোটে ছয়টি—মোট ১৪টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন, নেপালের তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণাধীন ২১৬ মেগাওয়াট আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে অ্যান্ড্রিটজ হাইড্রোর ৭৬ কর্মীর সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া রাসুওয়াগাড়ি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ৫১ জন এবং মাইলুং খোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাওয়ারহাউসে থাকা আটজনেরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
লাংটাং খোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে আটকা পড়া ৬০ জনের সঙ্গেও এখনো যোগাযোগ করা যায়নি। তাঁদের মধ্যে ২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৩৫ জন শ্রমিক।
অন্যদিকে ত্রিশূলী-৩বি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ৪৫ জন টেকনিশিয়ান, কর্মী ও পরামর্শকেরও কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পের টানেল থেকে নেপালি সেনাবাহিনী কয়েকজন শ্রমিককে উদ্ধার করলেও এখনো ৩৫ জন সেখানে আটকা রয়েছেন।
মরদেহ শনাক্তেও বিদেশি সহায়তা
নেপালের নিজস্ব পরীক্ষাগারগুলোর ডিএনএ পরীক্ষার সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় মরদেহ শনাক্তকরণেও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হবে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, বিপুলসংখ্যক নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় দ্রুত মরদেহ শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ক্ষেত্রেই বিদেশি সহায়তা নেওয়া হবে। উদ্ধার অভিযানের কোন কোন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিশেষজ্ঞ দলকে কাজে যুক্ত করা হচ্ছে।