দায়মিরা আক্তার : বাংলাদেশে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা নতুন নয়। প্রায় দুই দশক ধরে বিভিন্ন সরকার এই প্রকল্প নিয়ে কাজ করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের অবস্থান, আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং কৌশলগত গুরুত্ব পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে এটি কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; বরং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের উদ্যোগের সূচনা হয় ২০০৪ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়। ২০০৬ সালের আগস্টে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রাথমিক পরিকল্পনার জন্য জাপানের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান Pacific Consultants International (PCI)-কে বিবেচনা করা হয়। সে সময় বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল জাপানের কারিগরি দক্ষতা কাজে লাগিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা।
২০০৭ সালে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় PCI-এর সহযোগিতায় কক্সবাজার উপকূলের কাছে সোনাদিয়া দ্বীপকে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের উপযুক্ত স্থান হিসেবে প্রস্তাব করে। পরবর্তী সম্ভাব্যতা সমীক্ষার পর ২০০৯ সালে সোনাদিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্ভাব্য প্রকল্প এলাকা হিসেবে নির্বাচন করা হয়।
পরবর্তীতে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেইজিং সফরের সময় চীন সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে আগ্রহ প্রকাশ করে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান China Harbour Engineering Company (CHEC)-কে সম্ভাব্য ঠিকাদার হিসেবে আলোচনায় আনা হয়। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময়ও এই প্রকল্প নিয়ে অগ্রগতির প্রত্যাশা ছিল, তবে বাস্তবে তা এগোয়নি।
২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প থেকে সরে আসে। সরকার পরিবেশগত ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত কারণ উল্লেখ করলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের কৌশলগত উদ্বেগও এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছিল। যদিও এ বিষয়ে সরকারিভাবে এমন কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
সোনাদিয়া প্রকল্পের পরিবর্তে সরকার কক্সবাজারের কাছেই মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে অগ্রাধিকার দেয়। এই প্রকল্পে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা JICA অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে। মাতারবাড়ি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মাতারবাড়ি বন্দর চালু হলে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি বড় অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি হতে পারে। বর্তমানে অনেক বড় জাহাজকে সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা বা অন্যান্য বন্দরে ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশে পণ্য পাঠাতে হয়। গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে বড় জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশে নোঙর করতে পারবে, ফলে সময় ও ব্যয় উভয়ই কমবে। একই সঙ্গে নেপাল, ভুটান এবং ভবিষ্যতে মিয়ানমারের জন্যও বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে পরিণত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
অন্যদিকে, এই প্রকল্পের একটি ভূরাজনৈতিক দিকও রয়েছে। জাপান ও ভারতের মধ্যে ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত Act East Forum ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছে। বাংলাদেশে জাপানের বিভিন্ন অবকাঠামো বিনিয়োগকে অনেক বিশ্লেষক বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযোগ কৌশলের অংশ হিসেবে দেখেন। একই সময়ে চীনও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে তার উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করে আসছে।
ফলে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। জাপান, চীন, ভারতসহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, সোনাদিয়া থেকে মাতারবাড়িতে স্থানান্তর কেবল একটি প্রকল্প পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে—এই প্রতিযোগিতাকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জাতীয় স্বার্থকে সমানভাবে নিশ্চিত করা।