মুক্তমন রিপোর্ট:ছাত্র-জনতার টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চাপে সেদিন প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি পরিবহন বিমানে করে তিনি প্রথমে আগরতলা এবং পরে ভারতের দিল্লির কাছে হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান।
ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সংক্ষিপ্ত নোটিশে ভারতে প্রবেশের অনুমতি চেয়েছিলেন। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তিনি যদি বাংলাদেশ থেকে হেলিকপ্টারে আগরতলা পৌঁছাতে পারেন, তাহলে সেখান থেকে তাকে দিল্লিতে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
৫ আগস্ট দুপুরের দিকে শেখ হাসিনা গণভবন থেকে হেলিকপ্টারে করে বিমানবন্দরে যান। এরপর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি পরিবহন উড়োজাহাজে করে আগরতলা হয়ে গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান। তার সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা।
এর আগে ৪ আগস্ট সারা দেশে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে প্রায় ১০০ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে কয়েকজন পুলিশ সদস্যও ছিলেন। ওই দিন বিকেলে আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও উপদেষ্টা শেখ হাসিনাকে জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং মাঠে দলীয় নেতাকর্মীরা টিকতে পারছেন না।
তবে শুরুতে শেখ হাসিনা পরিস্থিতি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে মনে করলেও নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে জানান, পরিস্থিতি আর সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। এরপর তিনি পদত্যাগের বিষয়ে ভাবতে শুরু করেন।
৫ আগস্ট সকালে গণভবনে তিন বাহিনীর প্রধান ও পুলিশ প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। বৈঠকে তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সে সময় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জানান, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পুলিশের পক্ষে আগের মতো কঠোর অবস্থান ধরে রাখা আর সম্ভব নয়।
একপর্যায়ে নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা শেখ রেহানার সঙ্গে আলাদা বৈঠক করে শেখ হাসিনাকে পদত্যাগে রাজি করানোর অনুরোধ জানান। পরে বিদেশে অবস্থানরত সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে ফোনে কথা হয় এক শীর্ষ কর্মকর্তার। এরপর জয় তার মায়ের সঙ্গে কথা বললে শেখ হাসিনা পদত্যাগে সম্মত হন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
এদিকে, কঠোর কারফিউ উপেক্ষা করে ৫ আগস্ট সকাল থেকেই শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ ঢাকার বিভিন্ন সড়কে নেমে আসেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। একই দিনে সব ধরনের ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যায়।
দুপুরের দিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের জাতির উদ্দেশে ভাষণের ঘোষণা আসে। একই সময় দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তারা আন্দোলনকারীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, শিগগিরই একটি ‘সুখবর’ আসছে। এর কিছুক্ষণ পরই বিভিন্ন স্থানে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ে।
পরে সেনা দপ্তর থেকে নিশ্চিত করা হয়, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে সামরিক হেলিকপ্টারে ভারতের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
ভারতে পৌঁছানোর পর হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। একই দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা কমিটির জরুরি বৈঠকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
পরদিন ৬ আগস্ট লোকসভায় বক্তব্যে এস জয়শঙ্কর বলেন, কারফিউ সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা ঢাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের পর শেখ হাসিনা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন এবং সংক্ষিপ্ত নোটিশে ভারতে প্রবেশের অনুমতি চান। পরে প্রয়োজনীয় ফ্লাইট ক্লিয়ারেন্সের ব্যবস্থা করে তাকে দিল্লিতে নেওয়া হয়।