মুক্তমন রিপোর্ট : চীনের বিশাল বাজার ও অর্থনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি ১৪০ কোটির বেশি মানুষের ভারতীয় বাজারও জাপানের সরকারি ও বেসরকারি খাতের কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি নিরাপত্তার পরিবর্তিত সমীকরণে ভারতকে ঘিরে টোকিওর আগ্রহও বাড়ছে।
সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৬তম জাপান-ভারত বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে দুই দেশের সম্পর্কের এই পরিবর্তিত চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির ভারত সফরকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়।
প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিতে বাড়ছে সহযোগিতা
কোয়াডের কাঠামোর মধ্যে ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ গড়ে তোলার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে দক্ষ মানবসম্পদ বিনিময় এবং শিক্ষার্থী বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে দুই দেশ।
প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তাতেও সহযোগিতা বাড়ছে। ‘জাইমেক্স-২৫’ নৌমহড়ার ধারাবাহিকতায় ভারতীয় নৌবাহিনী ও জাপানের মেরিটাইম সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদারের অঙ্গীকার এসেছে।
এ ছাড়া জাপানের মোগামি-ক্লাস ফ্রিগেটে ব্যবহৃত ‘ইউনিকর্ন’ বা ইউনিফাইড কমপ্লেক্স রেডিও অ্যান্টেনা প্রযুক্তি ভারতে হস্তান্তরের বিষয়ে নীতিগত চুক্তি হয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর, বিরল খনিজ, আইসিটি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও ওষুধ—এই পাঁচ খাতকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভারতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ছে
জেট্রোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ভারতে ৫ হাজার ২০৫টি স্থানে ১ হাজার ৪৩৪টি জাপানি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। মহামারির পর দেশটিতে জাপানি কোম্পানিগুলোর সম্প্রসারণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সুজুকি, ব্রিজস্টোন ও ইউনিচার্মের মতো প্রতিষ্ঠান ভারতে নতুন কারখানা স্থাপন করে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ফ্যাশন ব্র্যান্ড ইউনিক্লো আগামী পাঁচ বছরে ভারতে ১০০টি স্টোর খোলার পরিকল্পনা করেছে। ৭-ইলেভেনও দেশটিতে ৬০টির বেশি আউটলেট পরিচালনা করছে।
ভারী শিল্পেও জাপানি বিনিয়োগ বাড়ছে। নিপ্পন স্টিল ভারতের আর্সেলরমিত্তালের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের বেশি বিনিয়োগ করে উৎপাদন সম্প্রসারণ করেছে। পাশাপাশি সানটোরি, সুমিতোমো রিয়েলটি, ওসাকা গ্যাস ও মোনোটারোর মতো প্রতিষ্ঠানও ভারতকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে।
গত বছর দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব আগামী ১০ বছরে ভারতে ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। সাম্প্রতিক সম্মেলনে গত এক বছরে ঘোষিত প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের অগ্রগতিও তুলে ধরা হয়।
অবকাঠামো ও জ্বালানিতে অংশীদারত্ব
প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতেও ভারত-জাপান সহযোগিতা বিস্তৃত হচ্ছে। মহাকাশ গবেষণার লুপেক্স মিশন, পুনর্ব্যবহারযোগ্য অ্যামোনিয়া উৎপাদন, বায়োমিথেন প্রকল্প ও ইস্পাত কারখানার গ্যাস প্ল্যান্ট পরিচালনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা রয়েছে।
জাপানি সহায়তায় নির্মিত দিল্লি মেট্রো ভারতের নগর পরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একইভাবে জাপানের অর্থায়নে আহমেদাবাদ-মুম্বাই রুটে ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন বা শিনকানসেন প্রকল্প নির্মাণাধীন।
জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (JBIC) জরিপেও টানা চতুর্থ বছরের মতো জাপানি কোম্পানিগুলোর আগামী তিন বছরের ব্যবসা সম্প্রসারণের সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে ভারত উঠে এসেছে।
জেট্রোর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ব্যবসা পরিচালনাকারী ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ জাপানি প্রতিষ্ঠান চলতি অর্থবছরে মুনাফা করার প্রত্যাশা করছে। ২০০০ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ভারতে জাপানের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ ৪৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে দুই দেশের বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যও ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
কেন ভারতের দিকে জাপানের নজর
ভারতের বড় ভোক্তা বাজার, দ্রুত অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিখাতে দক্ষ জনশক্তি এবং বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় বিকল্প কেন্দ্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা জাপানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়াচ্ছে।
তবে এই সম্পর্কের সম্প্রসারণ চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।
অন্যদিকে জাপানকে জনসংখ্যা হ্রাস, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতির মতো অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ফলে ভারতের বৃহৎ বাজার, তরুণ জনগোষ্ঠী ও দক্ষ মানবসম্পদ জাপানের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে ভারত-জাপান সম্পর্ক এখন শুধু গাড়ি, অবকাঠামো বা বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সরবরাহব্যবস্থা, সেমিকন্ডাক্টর, প্রতিরক্ষা, এআই, জ্বালানি, মহাকাশ ও মানবসম্পদ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে এশিয়ার পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ভারতের গুরুত্ব জাপানের কাছে আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে।
Muktomon/TA