ভারত-ইউরোপ বাণিজ্য পরিকল্পনায় রেলপথের বাইরেও বড় সুযোগ

ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোরের সম্ভাব্য বাণিজ্যপথ
ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোরের সম্ভাব্য বাণিজ্যপথ

মুক্তমন রিপোর্ট : ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর (আইএমইসি) আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে। ভারত থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনের জন্য জাহাজ ও রেলনির্ভর পথকে এই উদ্যোগের মূল আকর্ষণ হিসেবে দেখা হলেও এর আওতা কেবল পণ্য পরিবহনে সীমাবদ্ধ নয়। ডিজিটাল ক্যাবল, বিদ্যুৎ সংযোগ ও পরিচ্ছন্ন হাইড্রোজেন পরিবহনের মতো প্রকল্পও এর অংশ।

২০২৩ সালের জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে আইএমইসি ঘোষণার পর থেকে করিডোরটির অগ্রগতি নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। তবে বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এর বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পকে একই সময়সূচি দিয়ে বিচার করা বাস্তবসম্মত নয়। রেলপথ নির্মাণে সময় লাগলেও পৃথক অর্থায়ন ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ডিজিটাল ক্যাবল বা জ্বালানি অবকাঠামোর কাজ এগিয়ে যেতে পারে।

ডিজিটাল সংযোগে বড় সম্ভাবনা

আইএমইসির ডিজিটাল অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হলো ৯ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ব্লু রামান’ সাবসি ক্যাবল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘গ্লোবাল গেটওয়ে’ উদ্যোগের নথি অনুযায়ী, এতে প্রায় ৪০ কোটি ইউরো বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ইইউর পক্ষ থেকে ৩ কোটি ৭০ লাখ ইউরো দেওয়ার কথা রয়েছে।

এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রেলপথ পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই আইএমইসির ডিজিটাল সংযোগের সুফল পাওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে কোনো একটি প্রকল্পে বিনিয়োগ নিশ্চিত হওয়া মানেই পুরো করিডোরের অবকাঠামো প্রস্তুত হয়ে গেছে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

পণ্য পরিবহনে বড় চ্যালেঞ্জ

ভারত-ইউরোপ পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে আইএমইসির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে নিরবচ্ছিন্ন স্থল সংযোগ তৈরি করা। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ভারত থেকে জাহাজে পণ্য উপসাগরীয় বন্দরে পৌঁছানোর পর তা ট্রেনে করে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দিকে নেওয়া হবে এবং পরে আবার জাহাজে ইউরোপে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

একাধিকবার পণ্য স্থানান্তরের কারণে সময় ও ব্যয় বাড়তে পারে। ফলে ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করতে এই রুটকে প্রচলিত সমুদ্রপথের তুলনায় নির্ভরযোগ্যতা, সময় বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক সুবিধা দিতে হবে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের পণ্যবাহী রেলপথ বর্তমানে সৌদি আরব সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছালেও ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত প্রয়োজনীয় নিরবচ্ছিন্ন রেল সংযোগ এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি।

২০২৫ সালের আটলান্টিক কাউন্সিলের এক গবেষণায় সৌদি আরব, জর্ডান ও ইসরায়েলকে যুক্ত করার প্রস্তাবিত অংশকে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায় সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে হাইফা পর্যন্ত মৌলিক পণ্যবাহী রুট তৈরিতে প্রায় ৪ দশমিক ৮৬ থেকে ৫ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ঘাটতির ধারণাগত হিসাব দেওয়া হয়েছে।

নিরাপদ বিকল্প রুটের প্রয়োজন

বিশ্বের বিভিন্ন নৌপথে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা সংকট ও চলাচলে বিঘ্নের কারণে বিকল্প বাণিজ্যপথের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। নির্ভরযোগ্য বিকল্প রুট থাকলে কোনো একটি নৌপথে সমস্যা দেখা দিলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ শৃঙ্খল সচল রাখতে তা ব্যবহার করতে পারে।

তবে আইএমইসি সমুদ্রপথের সব ঝুঁকি পুরোপুরি এড়াতে পারবে না। উপসাগরীয় অঞ্চলের বন্দরে পৌঁছাতেও পণ্যবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে হতে পারে। ওমানের মাধ্যমে আরব সাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকারের বিকল্প নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে ওমানকে মূল করিডোরের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে।

শুধু রেললাইন নয়, প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ সেবা

আইএমইসির সাফল্যের জন্য শুধু রেললাইন নির্মাণ যথেষ্ট নয়। আন্তঃদেশীয় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, শুল্ক, চার্জ ও পণ্য পরিবহনের সময়সূচি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমন্বয় প্রয়োজন।

ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জনের জন্য ট্র্যাক নির্মাণের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য বুকিং ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট সময়সূচি এবং প্রতিটি ধাপে দ্রুত পণ্য স্থানান্তরের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।

একইভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ ও পরিচ্ছন্ন হাইড্রোজেন পরিবহনের মতো প্রকল্পের ক্ষেত্রেও অর্থায়ন, অবকাঠামো এবং সম্ভাব্য গ্রাহক নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকল্পভিত্তিক অগ্রগতিই গুরুত্বপূর্ণ

সম্পূর্ণ করিডোর একসঙ্গে প্রস্তুত হওয়ার অপেক্ষা না করে পৃথক প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা যেতে পারে। কোনো ডিজিটাল ক্যাবল বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হলে সেটি রেলপথ প্রস্তুত হওয়ার আগেই আইএমইসির বাস্তব সুফল দিতে পারে। একইভাবে অর্থায়ন ও ক্রেতা নিশ্চিত হলে বিদ্যুৎ বা হাইড্রোজেন সংযোগও আলাদাভাবে এগিয়ে যেতে পারে।

২০২৬ সালের এপ্রিলে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেনও হরমুজ প্রণালির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে আইএমইসির মতো বিকল্প সংযোগ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

সব মিলিয়ে আইএমইসির সাফল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক সমর্থনকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়ার ওপর। প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয়, সম্ভাব্য গ্রাহক ও বাস্তবায়নের সময়সূচি স্পষ্ট করা গেলে রেলপথ পুরোপুরি চালু হওয়ার আগেই ডিজিটাল যোগাযোগ, জ্বালানি ও অন্যান্য অবকাঠামো থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

Muktomon/TA