মুক্তমন রিপোর্ট : রাজবাড়ী শহরের প্রধান কাপড় বাজারে নারী উদ্যোক্তা জাকিয়া সুলতানাকে মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগের ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে ঢাকা রেঞ্জ পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওকে কেন্দ্র করে আলোচিত এ ঘটনার তদন্তে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মো. সায়ফুজ্জামান ফারুকী।
দুপুর ২টার দিকে তিনি জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে রাজবাড়ী শহরের প্রধান কাপড় বাজারে যান। সেখানে নারী উদ্যোক্তা জাকিয়া সুলতানার ‘আস্থা পোশাক শিল্প’ দোকান পরিদর্শন করেন। পরে বাজারের ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা।
জানা গেছে, গত ২৯ আগস্ট রাজবাড়ী শহরের প্রধান কাপড় বাজার এলাকায় স্থানীয় কাপড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জাকিয়া সুলতানার বিরোধের জেরে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশের উপস্থিতিতে তাকে প্রকাশ্যে মারধর ও অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়।
ঘটনার পর জাকিয়া সুলতানা তাকে প্রকাশ্যে শারীরিকভাবে হেনস্তা ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে গত ৩১ আগস্ট ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয় থেকে একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়। এতে সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার দায়-দায়িত্ব নিরূপণ, সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিতকরণ এবং পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তদন্ত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মো. সায়ফুজ্জামান ফারুকীকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের পুলিশ সুপার (অপারেশন) শাকিলা সুলতানা এবং রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. শামসুল হক। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সায়ফুজ্জামান ফারুকী বলেন, নারী উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যকার বিরোধের জেরে রাজবাড়ী বাজারে ঘটে যাওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. ইকবাল হোসেন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।
তিনি বলেন, ভাইরাল ভিডিওটির পেছনের ঘটনা, বিরোধের কারণ, এর অতীত ইতিহাস এবং কী প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি ঘটেছে—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে এবং তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি জানান, ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যদের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। পাশাপাশি নিরপেক্ষ ব্যক্তি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বক্তব্যও নেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে রেঞ্জ ডিআইজির কাছে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়টিও তদন্ত প্রতিবেদনে গুরুত্ব পাবে বলে জানান তিনি। বাজারের পরিবেশ আরও ভালো করতে ব্যবসায়ীদের কোনো পরামর্শ থাকলে তা প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলেও জানান অতিরিক্ত ডিআইজি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন তথ্য প্রচারের বিষয়েও তদন্ত করা হচ্ছে। অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, যেসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে গুজব বা অনাকাঙ্ক্ষিত ভিডিও ছড়ানো হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে প্রতিবেদনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হবে। প্রয়োজনে সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ঘটনাস্থলের ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শী, ব্যবসায়ী ও পুলিশ সদস্যদের বক্তব্যসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন। তদন্ত শেষে ঘটনার প্রকৃত চিত্র, সংশ্লিষ্টদের দায় এবং দায়িত্ব পালনে পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল কি না—তা প্রতিবেদনে উঠে আসবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পরিদর্শনকালে ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মো. সায়ফুজ্জামান ফারুকী, পুলিশ সুপার (অপারেশন) শাকিলা সুলতানা, রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. শামসুল হক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার ঘোষ, ডিবির ওসি মফিজুল ইসলামসহ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, নারী উদ্যোক্তা জাকিয়া সুলতানা সোমবার দিবাগত রাতে রাজবাড়ী সদর থানায় ৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলা দায়েরের পর পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়। পরে আসামিরা জামিনের আবেদন করলে আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর করেন।