মুক্তমন রিপোর্ট : বিশ্বের মোট হিমবাহের মাত্র ৩.২ শতাংশ ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে হিমবাহের মোট বরফ ক্ষয়ের অর্ধেকেরও বেশি ঘটিয়েছে। হ্রদ, সমুদ্র কিংবা বরফের স্তরের সঙ্গে যুক্ত এসব হিমবাহের বরফ হারানোর হার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে বিজ্ঞানীদের।
নেচার কমিউনিকেশন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, আলোচ্য সময়কালে এসব হিমবাহ থেকে প্রতিবছর গড়ে ১৩৪ বিলিয়ন টন বরফ হারিয়েছে। গবেষকদের মতে, হিমবাহের অবস্থান ও ধরন বরফ গলার গতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম ও ইউনিভার্সিটি অব লিডসের বিজ্ঞানীরা গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন। গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বিশাল বরফস্তর বাদ দিয়ে বিশ্বের ২ লাখ ১৬ হাজার ৫০২টি হিমবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করেন তাঁরা। হিমবাহগুলো কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে, তার ভিত্তিতে সেগুলোকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে বরফ প্রবাহ ও বরফ ক্ষয়ের হার তুলনা করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, হ্রদে গিয়ে শেষ হওয়া হিমবাহগুলো আকারের অনুপাতে স্থলভাগে শেষ হওয়া হিমবাহের তুলনায় প্রায় ৫৭ শতাংশ বেশি বরফ হারিয়েছে। অন্যদিকে, স্থলভাগে শেষ হওয়া হিমবাহের তুলনায় হ্রদে শেষ হওয়া হিমবাহের বরফ প্রবাহের গতি গড়ে ১০ শতাংশ বেশি। সমুদ্রে গিয়ে শেষ হওয়া হিমবাহের ক্ষেত্রে এ গতি ৪৪ শতাংশ বেশি।
গবেষকদের মতে, হ্রদের সঙ্গে যুক্ত হিমবাহের বরফ ক্ষয়ের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। হিমবাহের সামনের অংশ থেকে বড় বরফখণ্ড ভেঙে হ্রদে পড়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে ক্যালভিং বলা হয়। এ ছাড়া হ্রদের পানি পানির নিচে থাকা হিমবাহের অংশ গলিয়ে দিতে পারে। তবে হ্রদের প্রভাব, হিমবাহের আকার ও আকৃতি—কোনটি কতটা ভূমিকা রাখছে, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
গবেষণাটির প্রধান গবেষক ড. জো ম্যালালিউ বলেন, হ্রদে শেষ হওয়া হিমবাহগুলো দ্রুত বরফ হারাচ্ছে। এর পেছনের কারণগুলো ভালোভাবে বোঝা এখন গবেষকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন হিমবাহ হ্রদ তৈরি হওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমবাহের ভবিষ্যৎ অবস্থা অনুমান করতে ব্যবহৃত অনেক মডেলে হ্রদে শেষ হওয়া হিমবাহের বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি বিবেচনা করা হয় না। গবেষকদের তৈরি নতুন শ্রেণিবিন্যাস এ ঘাটতি পূরণে সহায়তা করতে পারে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পানির প্রাপ্যতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি সম্পর্কে পূর্বাভাস আরও নির্ভুল করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশ্বের প্রতিটি প্রধান হিমবাহ অঞ্চলে হ্রদে শেষ হওয়া হিমবাহের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অধিকাংশ অঞ্চলে এসব হিমবাহ স্থলভাগে কিংবা সমুদ্রে শেষ হওয়া হিমবাহের তুলনায় দ্রুত বরফ হারাচ্ছে।
জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার কারণে হিমবাহের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। আর্কটিক অঞ্চলের কিছু হিমবাহ সমুদ্র থেকে পিছু হটে স্থলভাগে শেষ হচ্ছে। অন্যদিকে, নতুন হিমবাহ হ্রদ তৈরি হওয়ায় কিছু স্থলভাগীয় হিমবাহ এখন হ্রদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। গবেষকদের ধারণা, এসব পরিবর্তনের প্রভাবও ভিন্ন হবে। সমুদ্র থেকে স্থলভাগে সরে আসা হিমবাহের বরফ ক্ষয়ের গতি কমতে পারে, অন্যদিকে হ্রদের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হওয়া হিমবাহ দ্রুত বরফ হারাতে পারে।
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. নিকোলাস ব্যারান্ড বলেন, গত এক দশকে হিমবাহ ও জলবায়ু নিয়ে গবেষণার জন্য বিপুল পরিমাণ নতুন তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। এসব তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন পরিবেশে থাকা হিমবাহের আচরণ তুলনা করা সম্ভব হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহের ধরন যত বদলাবে, তাদের আচরণের পার্থক্য বোঝার গুরুত্বও তত বাড়বে।
Muktomon/TA