কার্বন নিঃসরণ কমাতে জাতিসংঘের সতর্কবার্তা

বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে কার্বন নিঃসরণ কমানোর আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ
বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে কার্বন নিঃসরণ কমানোর আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ

মুক্তমন রিপোর্ট : জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব সীমিত রাখতে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত কমানোর আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে নিঃসরণ ১৮ শতাংশ এবং ২০৪৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কমানো গেলে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমান নীতি ও দেশগুলোর প্রতিশ্রুতির মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) বার্ষিক ‘এমিশন গ্যাপ’ প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব পদক্ষেপের উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাক্‌-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য অর্জন এখন অত্যন্ত কঠিন। তবে তাপমাত্রা এই সীমা কতটা অতিক্রম করবে এবং কত দিন তা স্থায়ী হবে, সেই মাত্রা কমিয়ে আনার সুযোগ এখনো রয়েছে।

গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট হারে নিঃসরণ কমানো সম্ভব হলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এতে দাবদাহসহ জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রভাব পুরোপুরি ঠেকানো না গেলেও পরিস্থিতির আরও অবনতি সীমিত করা সম্ভব হতে পারে।

নিঃসরণ কমাতে প্রয়োজন দ্রুত পদক্ষেপ

ইউএনইপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ আগের বছরের কাছাকাছি পর্যায়ে ছিল। তবে এটিকে নিঃসরণের সর্বোচ্চ পর্যায় বলে নিশ্চিত করতে রাজি নন বিশেষজ্ঞরা। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা এখনো অনেক বেশি।

ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক ইনগার অ্যান্ডারসেন বলেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারগুলোকে বছরের পর বছর সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেওয়ায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে।

তবে এই লক্ষ্য পুরোপুরি পরিত্যাগ না করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলেও সেই পরিস্থিতির স্থায়িত্ব কমিয়ে আনতে এখনই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

জলবায়ু সংকট মোকাবিলার প্রচেষ্টা রাজনৈতিক অবস্থান ও নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জলবায়ুবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট অ্যানালিটিক্সের প্রধান নির্বাহী বিল হেয়ার বলেন, বড় নিঃসরণকারী দেশগুলোর উচিত রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া।

বর্তমান প্রতিশ্রুতিতে উষ্ণতা বাড়ার আশঙ্কা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত কপ৩০ জলবায়ু সম্মেলনে দেশগুলোর দেওয়া নতুন প্রতিশ্রুতিগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলেও বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। আর বর্তমান জলবায়ুনীতি অব্যাহত থাকলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

জলবায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, তাপমাত্রা এভাবে বাড়তে থাকলে দাবদাহ, দাবানল এবং জলবায়ু ব্যবস্থার গুরুতর পরিবর্তনের ঝুঁকি আরও বাড়বে।

আফ্রিকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার শিফট আফ্রিকার পরিচালক মোহাম্মদ অ্যাডো বলেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলার প্রযুক্তি ও সমাধান এখন হাতের নাগালেই রয়েছে। সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকারগুলো প্রয়োজনীয় গতি দেখাতে পারছে না।

পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের পরিচালক জলবায়ুবিজ্ঞানী ইয়োহান রকস্ট্রমও দ্রুত পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, দেশগুলোর বর্তমান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলেও ২০৩৫ সালে বার্ষিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ প্রায় ৫০ গিগাটনে পৌঁছাতে পারে। অথচ তা ৩৫ গিগাটনের নিচে নামানো প্রয়োজন।

মিথেন নিঃসরণ কমানোর ওপরও গুরুত্ব

কার্বন ডাই-অক্সাইডের পাশাপাশি মিথেন নিঃসরণ কমানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে ইউএনইপি। মিথেন একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, যা স্বল্পমেয়াদে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এ গ্যাসের নিঃসরণ দ্রুত কমানো গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক দ্রুত ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং মিথেন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি গ্রহণ জরুরি। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি সরকারগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দ্রুত বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

Muktomon/TA