ফুডপান্ডার বিরুদ্ধে অভিযোগ

ফুডপান্ডার চার্জ ও ব্যবসায়িক নীতির বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকদের সংবাদ সম্মেলন
ফুডপান্ডার চার্জ ও ব্যবসায়িক নীতির বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকদের সংবাদ সম্মেলন

মুক্তমন রিপোর্ট : কমিশনের বাইরে বিভিন্ন চার্জ, অস্বচ্ছ হিসাব, অর্ডার বাতিলের লোকসান, একতরফা জরিমানা ও রিফান্ডের নামে অর্থ কেটে নেওয়ার অভিযোগ তুলে ফুডপান্ডার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকেরা। তাঁদের দাবি, কমিশনসহ সব ধরনের চার্জ মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় চট্টগ্রাম মহানগরের রেস্তোরাঁগুলোতে ফুডপান্ডার মাধ্যমে অর্ডার গ্রহণ বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।

শনিবার (১০ অক্টোবর) বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির চট্টগ্রাম মহানগর শাখার উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ ও দাবি তুলে ধরা হয়। এতে বক্তব্য দেন সংগঠনটির সভাপতি মো. ইমতিয়াজ উদ্দিন নওশাদ ও সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল হক। এ সময় চট্টগ্রামের বিভিন্ন রেস্তোরাঁর মালিকেরা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে রেস্তোরাঁ মালিকেরা বলেন, তাঁরা প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার বিরোধী নন; বরং এ ব্যবস্থায় ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা চান। তাঁদের অভিযোগ, ফুডপান্ডার বর্তমান নীতির কারণে রেস্তোরাঁগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। এতে ব্যবসার মুনাফা কমার পাশাপাশি কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

রেস্তোরা মালিকদের অভিযোগ, চুক্তিতে নির্ধারিত কমিশনের বাইরে অনলাইন পেমেন্ট চার্জ, অপেক্ষার মাশুল, কমিশনের ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), ট্যাব ফি ও ইন্টারনেট ফিসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ কেটে নেওয়া হয়। এসব কর্তনের কারণে বিক্রি ভালো হলেও সব খরচ বাদ দিয়ে হাতে সামান্য অর্থ থাকে বলে দাবি তাঁদের।

তাঁদের আরও অভিযোগ, মাস শেষে পাঠানো হিসাব জটিল হওয়ায় কোন খাতে কত টাকা কাটা হয়েছে, তা বুঝতে সমস্যা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্তনের কারণ সম্পর্কেও স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এতে প্রকৃত বিক্রি, কমিশন ও আয় যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।

রেস্তোরাঁ মালিকদের ভাষ্য, ফুডপান্ডার প্রযুক্তিগত সমস্যা বা সরবরাহ ব্যবস্থাপনার জটিলতার কারণে অর্ডার বাতিল হলেও এর আর্থিক দায় অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের বহন করতে হয়। খাবার তৈরিতে কাঁচামাল, শ্রম ও সময় ব্যয়ের পর অর্ডার বাতিল হলে সেই খাবার অন্য গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা সব সময় সম্ভব হয় না।

রাইডার দেরিতে খাবার সংগ্রহ করার কারণে গ্রাহক অর্ডার বাতিল করলেও রেস্তোরাঁকে জরিমানা বা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা। যে বিলম্বের জন্য রেস্তোরাঁ দায়ী নয়, তার দায়ও কেন তাদের নিতে হবে—এ প্রশ্ন তুলেছেন মালিকেরা।

গ্রাহকের অভিযোগের ভিত্তিতে রিফান্ড দেওয়ার ক্ষেত্রেও একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে দাবি তাঁদের। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য না শুনেই পাওনা থেকে অর্থ কেটে নেওয়া হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়।

রেস্তোরাঁ মালিকদের আরেকটি অভিযোগ, ফুডপান্ডার মাধ্যমে বিক্রি হওয়া খাবারের টাকা পেতে ১৩ দিন বা তার বেশি সময় লাগে। অথচ কর্মচারীদের বেতন, দোকানভাড়া, কাঁচামাল কেনা ও বিদ্যুৎ বিলসহ নিয়মিত ব্যয় মেটাতে হয় প্রতিদিনই। বিক্রির অর্থ দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে চলতি মূলধনের সংকট তৈরি হয় বলে জানান তাঁরা।

তাঁদের মতে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিক্রি বাড়লেও অতিরিক্ত চার্জ ও বিভিন্ন কর্তনের কারণে প্রকৃত মুনাফা কমে যাচ্ছে। ফলে বিক্রি বাড়ার সুফল পুরোপুরি পাচ্ছেন না রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা।

সংবাদ সম্মেলনে রেস্তোরাঁ মালিকেরা ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন। এগুলো হলো—

১. কমিশনের বাইরে সব ধরনের অতিরিক্ত চার্জ বাতিল করতে হবে।

২. সহজবোধ্য ও স্বচ্ছ খাতওয়ারি হিসাব দিতে হবে।

৩. রেস্তোরাঁর দোষ ছাড়া অর্ডার বাতিল হলে খাবারের সম্পূর্ণ খরচ বহন করতে হবে।

৪. রাইডারের বিলম্বের কারণে রেস্তোরাঁকে জরিমানা করা বন্ধ করতে হবে।

৫. অভিযোগ যাচাই এবং রেস্তোরাঁর বক্তব্য না শুনে অর্থ কর্তন বন্ধ করতে হবে।

৬. সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে বিক্রির টাকা পরিশোধ করতে হবে।

দেশীয় খাবার সরবরাহকারী প্ল্যাটফর্ম ফুডির উদাহরণ দিয়ে রেস্তোরাঁ মালিকেরা বলেন, দেশীয় প্রতিষ্ঠান ১৫ শতাংশ সমন্বিত কমিশনে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারলে ফুডপান্ডার ক্ষেত্রে কমিশনের বাইরে অতিরিক্ত চার্জ রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের দাবি, সব চার্জ কমিশনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ সমন্বিত কমিশন নির্ধারণ করতে হবে।

রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি জানিয়েছে, ফুডপান্ডা কর্তৃপক্ষ দাবিগুলো মেনে না নিলে চট্টগ্রাম মহানগরের রেস্তোরাঁগুলো সম্মিলিতভাবে এ প্ল্যাটফর্মে অর্ডার গ্রহণ স্থগিত বা পুরোপুরি বন্ধ করার কর্মসূচি নিতে পারে।

একই সঙ্গে অনলাইন খাবার সরবরাহ খাতে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তাঁরা। এ খাতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নেরও দাবি জানিয়েছেন রেস্তোরাঁ মালিকেরা, যাতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ব্যবসা করতে গিয়ে দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বৈষম্যের শিকার না হন।

Muktomon/TA