দিল্লিতে ফের ইন্টারনেট বন্ধ, পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ

দিল্লিতে ফের ইন্টারনেট বন্ধ, পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ

অনলাইন ডেস্ক : পরীক্ষা কেলেঙ্কারির পর জবাবদিহি ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে চলমান ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বুধবার (২২ জুলাই) নতুন করে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত পাঁচজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে। একই সঙ্গে দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় আবারও ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার যন্তর মন্তরের মূল বিক্ষোভস্থল তুলনামূলক শান্ত থাকলেও সংসদ মার্গ এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। জবাবে বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করেন।

একপর্যায়ে কনট প্লাজার প্রধান রেডিয়াল রোড ধরে আন্দোলনকারীরা পুলিশ সদস্যদের ধাওয়া করেন। পরে পার্ক হোটেলের কাছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।

দিল্লি পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে দুই এসিপি, একজন পরিদর্শক, একজন হেড কনস্টেবল ও একজন কনস্টেবল আহত হয়েছেন।

এর আগে পরীক্ষাসংক্রান্ত অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির পর জবাবদিহি, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন বিরোধী দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার পর আরও বড় আকার ধারণ করে। বুধবার নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে হাজারো আন্দোলনকারী জড়ো হন।

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলেও বর্তমানে বিক্ষোভকারীদের দাবির তালিকায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগও যুক্ত হয়েছে। সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা যন্তর মন্তর ছাড়বেন না।

তিনি বলেন, ‘যে দেশে মানুষ প্রশ্ন করতে ভুলে গিয়েছিল, যে দেশে সরকারের সমালোচনাকে দেশদ্রোহিতা হিসেবে দেখা হতো, আমরা সেই দেশকে জাগিয়ে তুলেছি।’

মঙ্গলবার বিরোধী দলগুলো আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী পুলিশের দমন-পীড়নের জন্য সরকারের ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন। মঙ্গলবার তাকে বিক্ষোভস্থল থেকে আটক করে প্রায় দুই ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়া হয়।

এদিকে সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশের তরুণদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলা একটি বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নীরব রয়েছেন।

কীভাবে শুরু হলো আন্দোলন

গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি মামলার শুনানিতে তরুণদের ‘ককরোচ’ ও ‘পরজীবী’ হিসেবে উল্লেখ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। ওই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। এর পর ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া হিসেবে অনলাইনভিত্তিক আন্দোলন ককরোচ জনতা পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে।

পরবর্তীতে বেকারত্ব, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং সরকারের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী আচরণসহ বিভিন্ন ইস্যু আন্দোলনের কর্মসূচিতে যুক্ত হয়।

সোমবার বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনে আন্দোলনকারীরা পার্লামেন্টের দিকে পদযাত্রার চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। পরে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দিল্লিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সংস্থাটি বলেছে, আন্দোলন দমনে পুলিশের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার শর্ত পূরণ করেছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

সংস্কারের আশ্বাস শিক্ষামন্ত্রীর

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ বিভিন্ন পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের পর এই আন্দোলনের সূত্রপাত। এসব ঘটনায় বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে।

চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেছেন, সরকার শিক্ষা খাতে সংস্কার এবং পার্লামেন্টে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সোমবারের সংঘর্ষের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছে সরকারের জবাবদিহি ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তার ভাষায়, শিক্ষার্থীরা বিশৃঙ্খলার চেয়ে নিশ্চয়তা, স্লোগানের চেয়ে সমাধান এবং বিঘ্নের চেয়ে দায়িত্বশীলতা পাওয়ার যোগ্য।

দিল্লির বাইরে মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও গোয়াতেও সিজেপির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। ফলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলন দেশটির সরকারের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে।