রেজাউল করিম নোমান : উত্তরার আব্দুল্লাহপুর স্লুইস গেটের পাশ দিয়ে প্রবাহিত কালো ও দুর্গন্ধময় পানির ধারা দেখে অনেকেই একে সাধারণ একটি ড্রেন বা খাল মনে করেন। অথচ খুব বেশি দিন আগেও এটি ছিল উত্তর ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক জলপথ—ঐতিহাসিক কনাই নদ।
ইতিহাস বলছে, ১৭৬৫ সালে জেমস রেনেলের মানচিত্রে কনাই নদের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৭ কিলোমিটার। পরে ১৮৮৮ থেকে ১৯৪০ সালের ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে (সিএস) মানচিত্রেও নদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ কিলোমিটার উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নগরায়ণ, দখল ও ভরাটের ফলে ২০২২ সালের জরিপে এর অস্তিত্ব সংকুচিত হয়ে মাত্র প্রায় ২ কিলোমিটারে নেমে এসেছে।
একসময় তুরাগ নদ (টঙ্গী খাল) থেকে উৎপন্ন হয়ে দিয়াবাড়ি, বাউনিয়া ও আলোকদি হয়ে কনাই নদ মিরপুরের বিস্তীর্ণ জলাভূমির সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। বর্ষা মৌসুমে নদটি উজানের পানি ধারণ করে আশপাশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করত, যা কৃষিজমির উর্বরতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। একই সঙ্গে এটি উত্তর ঢাকার প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের অন্যতম মাধ্যম ছিল।
পরবর্তীতে উত্তরা মডেল টাউন নির্মাণ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অংশ হিসেবে আব্দুল্লাহপুরে স্লুইস গেট নির্মাণের পর নদটির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়। এরপর ধীরে ধীরে কনাই নদ মানচিত্রে ‘খিদির খাল’ বা ‘রাজউক খাল’ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে।
গত চার দশকে উত্তরা, দিয়াবাড়ি ও মিরপুর এলাকায় দ্রুত নগরায়ণ, জলাভূমি ভরাট এবং অবৈধ দখলের কারণে নদটি প্রায় অস্তিত্ব হারিয়েছে। বর্তমানে গৃহস্থালির বর্জ্য, স্যুয়ারেজের পানি ও বিভিন্ন ধরনের দূষণে এর পানি কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে। অনেক স্থানে নদীর প্রবাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে এটি কার্যত একটি ড্রেনে পরিণত হয়েছে।
তবে আশার খবরও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে নদীটির কিছু অংশে খনন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। পাশাপাশি ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’ প্রকল্পের আওতায় কনাই নদকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, রাজধানীর জলাবদ্ধতা কমানো, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে কনাই নদের মতো ঐতিহাসিক জলপথ পুনরুদ্ধার অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্ব খাল-নদীতে ময়লা-আবর্জনা না ফেলা এবং প্রাকৃতিক জলপথ সংরক্ষণে সচেতন ভূমিকা রাখা।
হারিয়ে যাওয়া কনাই নদ হয়তো আর আগের রূপে ফিরবে না, তবে পরিকল্পিত উদ্যোগ ও জনসচেতনতার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক জলধারাকে নতুন জীবন দেওয়া সম্ভব—এমন আশাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।