বিশেষ প্রতিনিধি : একটি নিয়মিত প্রশিক্ষণ উড়ান। আকাশে হঠাৎ উচ্চতা হারাতে থাকা একটি যুদ্ধবিমান। গ্রাউন্ড কন্ট্রোলের একের পর এক সতর্কবার্তা। পাইলটকে ইজেক্ট করার নির্দেশ। আর এর কয়েক সেকেন্ড পরই উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনের সামনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ।
২০২৫ সালের ২১ জুলাইয়ের সেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৩৬ জন। নিহতদের মধ্যে ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক, একজন নারী কর্মচারী, তিনজন অভিভাবক এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম ছিলেন। আহত হন আরও ৬৪ জন।
এক বছর পর তদন্ত প্রতিবেদন, সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে—মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি কোনো একক ভুল বা আকস্মিক দুর্ঘটনার ফল ছিল না। পাইলটের প্রশিক্ষণ ঘাটতি, দুর্বল তদারকি, ভবনের নিরাপত্তা ত্রুটি, অনুমোদনহীন নির্মাণ, বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় উচ্চতা বিধি লঙ্ঘন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা মিলেই তৈরি হয়েছিল ভয়াবহ ঝুঁকির পরিবেশ।
কয়েক সেকেন্ডেই আগুনের বিভীষিকা
দুর্ঘটনার পরপরই বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার স্থানে বিস্ফোরণ ঘটে। তদন্ত কমিশনের নথিতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে বলা হয়েছে, আগুনের শিখা ১৫ থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত উঠে যায়। প্রথম বিস্ফোরণের তিন থেকে চার মিনিট পর ঘটে আরও একটি বিস্ফোরণ।
বিমানটি আছড়ে পড়ার পর মাটিতে বড় গর্ত তৈরি হয় এবং বিমানের একটি অংশ হায়দার আলী ভবনের বেইসমেন্টে ঢুকে যায়। তখন ভবনের ভেতরে চলছিল ক্লাস। মুহূর্তের মধ্যে স্কুল ভবনটি পরিণত হয় আগুন, ধোঁয়া ও আতঙ্কের কেন্দ্রে।
পাইলটের প্রশিক্ষণ ও তদারকিতে ঘাটতি
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্ত বোর্ডের প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামের প্রশিক্ষণে ধারাবাহিকতার ঘাটতি ছিল। পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতির পাশাপাশি কমান্ডিং অফিসার ও গ্রাউন্ড সুপারভাইজারের তদারকিও যথেষ্ট ছিল না।
ফলে উড্ডয়নের সময় নির্ধারিত প্যারামিটার বজায় রাখতে ব্যর্থ হন পাইলট। সংকটের মুহূর্তে যথাযথ প্রতিক্রিয়া জানাতে না পারায় বিমানটি ‘স্টলিং কন্ডিশনে’ চলে যায়। অর্থাৎ, বিমানের ডানা পর্যাপ্ত উত্তোলন শক্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে বিমানটিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো সম্ভব হয়নি।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, পাখি বা অন্য কোনো উড়ন্ত বস্তু বিমানের উইন্ডশিল্ডে আঘাত করে থাকতে পারে। তবে দুর্ঘটনার আগে বিমানের ইঞ্জিন বা হাইড্রোলিক সিস্টেমে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
চূড়ান্ত বাঁক নেওয়ার সময় বিমানের ‘অ্যাংগেল অব অ্যাটাক’ নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছিল। সংকটময় মুহূর্তে বিমানটিকে নিয়ন্ত্রণে ফেরানো সম্ভব হয়নি।
তদন্ত কমিশনের মতে, নির্ধারিত ফ্লাইট প্রোফাইল পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি। প্রশিক্ষণ পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে পাইলটকে আবার ‘ইনিশিয়ালে’ ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে।

একটি ভবন, মাত্র একটি সিঁড়ি
বিমানটি যেখানে আছড়ে পড়ে, সেই হায়দার আলী ভবনটিও ছিল নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ভরা। তিনতলা ভবনটিতে ছিল মাত্র একটি সিঁড়ি।
ফায়ার সার্ভিস তদন্ত কমিশনকে জানিয়েছে, ভবনের আয়তন ও ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিবেচনায় সেখানে অন্তত তিনটি জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি থাকা উচিত ছিল। ফলে আগুন ও বিস্ফোরণের পর শত শত শিক্ষার্থীর জন্য কার্যত একটি পথই খোলা ছিল।
অগ্নিনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত বিকল্প বহির্গমন ব্যবস্থা থাকলে প্রাণহানি অনেক কমানো সম্ভব হতে পারত।
ভবনটির নির্মাণ অনুমোদনের কাগজপত্রও তদন্ত কমিশনের কাছে উপস্থাপন করতে পারেনি মাইলস্টোন স্কুল কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের অনুমোদনের কথা বলা হলেও এর পক্ষে কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
তদন্ত কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মাইলস্টোন ক্যাম্পাসের ১৭টি ভবনের মধ্যে অনুমোদন ছিল মাত্র সাতটির। অর্থাৎ, বাকি ভবনগুলো অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ বা ব্যবহার করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
বিমানবন্দরসংলগ্ন ৬৩০ ভবন নিয়ে প্রশ্ন
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি শুধু একটি ভবনের নিরাপত্তা ঘাটতিকে সামনে আনেনি; বরং বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় বছরের পর বছর ধরে চলা নগর পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতার চিত্রও প্রকাশ করেছে।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় ৬৩০টি ভবনের উচ্চতাসংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়ে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) একাধিকবার রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) জানিয়েছে। তবে এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বেবিচকের নিয়ম অনুযায়ী, মাইলস্টোন ক্যাম্পাস ‘অবস্ট্যাকল লিমিটেশন সারফেস’ বা ওএলএস এলাকার মধ্যে পড়ে। এই এলাকায় ১৫০ ফুটের বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণ নিষিদ্ধ।
তবে মাইলস্টোন ক্যাম্পাস এই বিধি লঙ্ঘন করেছে কি না, তা রাজউক নিশ্চিতভাবে জানে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনার পর কিছুদিন প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা গেলেও সময়ের সঙ্গে তদন্ত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়টি অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে।
ক্ষতিপূরণ ও বিচার এখনো অনিশ্চিত
মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবার ও আহতদের জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হলেও তা নিয়ে জটিলতা রয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ২০ লাখ এবং আহতদের প্রত্যেককে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে পরিবারগুলো সেই ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করে।
পরবর্তীতে তদন্ত কমিশন নিহত শিশুদের পরিবারকে এক কোটি টাকা, প্রাপ্তবয়স্ক নিহতদের পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা এবং দগ্ধদের ১৫ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তার সুপারিশ করে।
কিন্তু এক বছর পরও সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।
ফলে নিহত ও আহতদের পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা সহায়তা এবং দুর্ঘটনার দায় নির্ধারণের বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
৩০ সুপারিশের বাস্তবায়ন কতদূর?
দুর্ঘটনার পর কারণ ও দায়দায়িত্ব নির্ধারণে একটি তদন্ত কমিশন এবং একটি কারিগরি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কারিগরি তদন্ত কমিটি ৫ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্ত কমিশনের প্রায় ৩০টি সুপারিশের মধ্যে ছিল বিমানবন্দরের আশপাশে পাখি, ড্রোন ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা অঞ্চলে ভবনের উচ্চতার পাশাপাশি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোচ সারফেস এলাকায় নতুন স্কুল-হাসপাতালসহ জনসমাগমপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া।
এ ছাড়া ঢাকার বাইরে ঘনবসতি থেকে দূরে নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের সুপারিশও করা হয়।
তবে এসব সুপারিশের বাস্তবায়ন এখনো ধীরগতির।
দুর্ঘটনা কয়েক সেকেন্ডের, ব্যর্থতা বহু বছরের
মাইলস্টোনে সেদিন একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়েছিল। কিন্তু ৩৬ জনের মৃত্যু শুধু ওই বিমানটির কারণে ঘটেনি।
পাইলটের প্রশিক্ষণে ঘাটতি ছিল। তদারকিতে দুর্বলতা ছিল। স্কুল ভবনে পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন ছিল না। নির্মাণ অনুমোদনের নথি নিয়ে প্রশ্ন ছিল। বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় বছরের পর বছর ভবনের উচ্চতা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ছিল।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একে অন্যকে সতর্ক করেছে, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
২১ জুলাইয়ের বিস্ফোরণটি ঘটেছিল কয়েক সেকেন্ডে। কিন্তু সেই বিপর্যয়ের পেছনে ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল বহু বছর ধরে।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি তাই শুধু একটি বিমান দুর্ঘটনার গল্প নয়। এটি এমন এক ব্যবস্থার গল্প, যেখানে সতর্কতা ছিল, কিন্তু পদক্ষেপ ছিল না; নিয়ম ছিল, কিন্তু প্রয়োগ ছিল না; তদন্ত ছিল, কিন্তু সুপারিশ বাস্তবায়ন ছিল না।
আর সেই ব্যর্থতার মূল্য দিতে হয়েছে শিশু, শিক্ষক, অভিভাবক এবং একজন পাইলটের জীবন দিয়ে।
