মো: তোফায়েল করিম খান : বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় অতিক্রম করছে। দীর্ঘদিনের দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, রাজনৈতিক প্রভাব, সুশাসনের ঘাটতি এবং আইনি জটিলতার কারণে খেলাপি ও অন্যান্য সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের শেষে মোট ঋণের বিপরীতে ডিস্ট্রেসড অ্যাসেটের পরিমাণ প্রায় ১০.৯ লাখ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশের সমান। এই বিপুল অঙ্কের সম্পদ ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে আটকে থাকায় নতুন ঋণ বিতরণ, মুনাফা, তারল্য এবং মূলধন পর্যাপ্ততা—সবকিছুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন, ২০২৬-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে। এই আইনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে Distressed Asset Management Unit (DAMU)—বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, যা দেশে একটি কার্যকর Distressed Asset Market গড়ে তোলার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
DAMU কী?
DAMU নিজে কোনো খেলাপি ঋণ কিনবে না। বরং এটি হবে একটি লাইসেন্সিং, নিয়ন্ত্রক ও তদারকি কর্তৃপক্ষ। DAMU-এর অনুমোদন নিয়ে বেসরকারি Distressed Asset Management Company (DAMC) খেলাপি ঋণ ব্যাংক থেকে কিনবে এবং সেগুলো পুনরুদ্ধার, পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল, জামানত ব্যবস্থাপনা কিংবা বিনিয়োগকারীর কাছে বিক্রির মাধ্যমে মূল্য উদ্ধার করবে। প্রয়োজনে Loan Servicer Company এবং Distressed Asset Enforcement Taskforce-এর সহায়তাও নেওয়া হবে।
কেন DAMU প্রয়োজন?
বাংলাদেশে ব্যাংকগুলো ঐতিহ্যগতভাবে নিজেরাই খেলাপি ঋণ আদায়ের চেষ্টা করে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ব্যাংকের পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি কিংবা আইনি সক্ষমতা নেই। ফলে বছরের পর বছর মামলা চলতে থাকে, সম্পদের মূল্য কমে যায় এবং পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়। DAMU একটি Secondary Market for Distressed Assets তৈরি করবে, যেখানে সমস্যাগ্রস্ত ঋণও একটি ক্রয়-বিক্রয়যোগ্য আর্থিক সম্পদে পরিণত হবে। এতে ব্যাংক দ্রুত ব্যালান্স শিট পরিষ্কার করতে পারবে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ফিরে পাবে।
ব্যাংকিং খাতে সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব:
যদি আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে :
* ব্যাংকের NPL ও Distressed Asset দ্রুত কমবে।
* Provisioning-এর চাপ কমে মূলধন পর্যাপ্ততা (Capital Adequacy) উন্নত হবে।
* ব্যাংকের ব্যালান্স শিট শক্তিশালী হবে।
* নতুন ঋণ প্রদানের সক্ষমতা বাড়বে।
* বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।
* অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক হবে।
এটি Basel III, IFRS 9 এবং Risk-Based Supervision (RBS)-এর লক্ষ্য অর্জনেও সহায়ক হতে পারে, কারণ সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ দ্রুত শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হবে।
তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিও রয়েছে:
শুধু DAMU প্রতিষ্ঠা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রথমত, খেলাপি ঋণের সঠিক মূল্য নির্ধারণ (Valuation) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ঋণ বিক্রি হলে বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আবার খুব কম দামে বিক্রি হলে ব্যাংকের আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, DAMU-এর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক বা কর্পোরেট প্রভাব থাকলে এটি তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারবে না।
তৃতীয়ত, দক্ষ Loan Servicer, পেশাদার মূল্যায়নকারী, বিশেষায়িত আইনজীবী এবং দ্রুত বিচারব্যবস্থা ছাড়া এই কাঠামো কার্যকর হবে না।
চতুর্থত, DAMU যেন কখনোই ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের জন্য "সহজ প্রস্থান" (Easy Exit) বা নৈতিক ঝুঁকি (Moral Hazard) সৃষ্টি না করে, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা:
মালয়েশিয়ার Danaharta, দক্ষিণ কোরিয়ার KAMCO এবং ভারতের NARCL (National Asset Reconstruction Company Limited) প্রমাণ করেছে যে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা থাকলে একটি Distressed Asset Management Framework ব্যাংকিং খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সফলতার মূল কারণ ছিল শক্তিশালী আইনি ক্ষমতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত পরিচালনা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।
DAMU বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি যুগান্তকারী সংস্কার হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। তবে এটি কোনো "যাদুকরী সমাধান" নয়। এর সফলতা নির্ভর করবে স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ মূল্যায়ন, দক্ষ পেশাদার ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী আইনি কাঠামো এবং কঠোর জবাবদিহির ওপর।
লেখক : ব্যাংকার, সিপিসি ক্রেডিট অপারেশন ডিপার্টমেন্ট, ঢাকা ব্যাংক পিএলসি