এডিবির সতর্কবার্তা

বাংলাদেশেই দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা

বাংলাদেশেই দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক : দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ দ্রুত কমার সম্ভাবনা নেই।

জুলাই মাসে প্রকাশিত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (Asian Development Outlook) প্রতিবেদনে এডিবি জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে পাকিস্তানে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, আফগানিস্তানে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং নেপালে ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ভারত, ভুটান ও মালদ্বীপে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করলেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। নীতিগত সুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত করা, বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক হ্রাস এবং বাজার তদারকির উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষে জুন মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। ফলে আয় বাড়লেও মূল্যস্ফীতির তুলনায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

এডিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের প্রভাব এখনও অর্থনীতিতে পুরোপুরি কাটেনি। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থনীতিতে এই পরিস্থিতিকে ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’ বা ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও তীব্র হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এডিবির বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আকিরা মাতসুনাগা বলেছেন, টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য শুধু মুদ্রানীতি নয়, বরং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা, আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে সংস্কার জোরদার করা জরুরি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান মূল্যস্ফীতির পেছনে শুধু বৈশ্বিক কারণ নয়, দেশের বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রাখছে। আমদানি থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলে কার্যকর নজরদারির অভাবে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর পড়ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়েও সতর্কতা জানানো হয়েছে। এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে দুর্বল বিনিয়োগ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা প্রবৃদ্ধিকে চাপে রাখবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

তবে চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক দিক হিসেবে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং সেবা খাতের স্থিতিশীল অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছে এডিবি। সংস্থাটির মতে, প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিও আরও শক্তিশালী হবে।