আন্তর্জাতিক ডেস্ক : সূর্যগ্রহণ শুধু আকাশের একটি বিরল দৃশ্য নয়; মহাবিশ্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের জন্যও এটি বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ সুযোগ তৈরি করে। সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্ব যাচাই এবং দূরবর্তী গ্রহের বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার ক্ষেত্রেও গ্রহণের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব রয়েছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) উত্তর গোলার্ধের বিভিন্ন অঞ্চলে সূর্যগ্রহণের ঘটনা বিজ্ঞানী ও আকাশ পর্যবেক্ষকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও উত্তর স্পেনের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যায়। আয়ারল্যান্ডসহ কয়েকটি এলাকায় দেখা যায় আংশিক গ্রহণ।
সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে অবস্থান করায় সূর্যের উজ্জ্বল পৃষ্ঠের একটি বড় অংশ বা পুরোটা সাময়িকভাবে আড়াল হয়ে যায়। পূর্ণগ্রাস গ্রহণের ক্ষেত্রে এর ফলে সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল বা করোনা তুলনামূলকভাবে স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সূর্যের উজ্জ্বল পৃষ্ঠের আলো সাধারণত করোনার তুলনামূলক ক্ষীণ বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণে বাধা সৃষ্টি করে। পূর্ণগ্রাস গ্রহণে চাঁদ সেই আলো আড়াল করায় করোনার গঠন ও আচরণ সম্পর্কে গবেষণার সুযোগ বাড়ে।
এর পেছনে রয়েছে পৃথিবী থেকে সূর্য ও চাঁদের আপাত আকারের একটি বিশেষ সামঞ্জস্য। সূর্য চাঁদের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ প্রশস্ত হলেও পৃথিবী থেকে সেটি প্রায় ৪০০ গুণ দূরে। ফলে আকাশে দুই বস্তু প্রায় একই আকারের বলে মনে হয় এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চাঁদ সূর্যের উজ্জ্বল অংশকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলতে পারে।
সূর্যগ্রহণের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব অবশ্য শুধু সূর্য পর্যবেক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় এক শতাব্দী আগে, ১৯১৯ সালের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের পর্যবেক্ষণ আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখে। সূর্যের মহাকর্ষীয় প্রভাবে দূরবর্তী নক্ষত্রের আলো বাঁকতে পারে—তৎকালীন পর্যবেক্ষণে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
বর্তমান জ্যোতির্বিজ্ঞানেও গ্রহণের একই মৌলিক ধারণা নতুনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কোনো গ্রহ তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে অতিক্রম করলে নক্ষত্রের আলোতে সামান্য পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দূরবর্তী বহির্গ্রহ বা এক্সোপ্ল্যানেটের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।
বিশেষ করে গ্রহের বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে নক্ষত্রের আলো যাওয়ার সময় আলোর নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যে পরিবর্তন ঘটতে পারে। এসব পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করেন।
ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি ও পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি অন্য নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা গ্রহগুলোতে প্রাণের সম্ভাব্য চিহ্ন অনুসন্ধানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
অর্থাৎ, কয়েক মিনিটের একটি সূর্যগ্রহণ মানুষের কাছে হয়তো একটি মনোমুগ্ধকর আকাশীয় ঘটনা; কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে এটি সূর্য, নক্ষত্র, গ্রহ এবং মহাবিশ্বের মৌলিক নিয়ম সম্পর্কে নতুন তথ্য জানার একটি অনন্য প্রাকৃতিক পরীক্ষাগার।