মুক্তমন রিপোর্ট : জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসনসংকট, শিক্ষা খাতে বাজেট ছাঁটাই ও রাজনৈতিক দুর্নীতির প্রতিবাদে ইউরোপের অন্তত নয়টি দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, গ্রিস, জার্মানি, আলবেনিয়া ও অস্ট্রিয়ায় তরুণ ও শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছেন। কয়েকটি দেশে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেওয়ায় ঐতিহাসিক স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের সংকট, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এবং শিক্ষা খাতে অর্থায়ন কমানোর মতো বিষয়। এসব সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন দেশের তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
ইউরোপের চলমান বিক্ষোভের মধ্যে ফ্রান্সের পরিস্থিতি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। দেশটির লিমোজ শহরে বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে ঐতিহ্যবাহী সিটি হলের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে টিকে থাকা ভবনটির ছাদের অধিকাংশ ধসে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবরের সপ্তাহান্তে রাজধানী প্যারিসসহ একাধিক শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর দেশজুড়ে ১১০টি বিক্ষোভে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ অংশ নেন। তবে আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল আট লাখ। এসব ঘটনায় প্রায় ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের চার শহরে দুই রাতের জন্য আংশিক কারফিউ জারি করা হয়।
প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষা খাতে অর্থসংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অনিশ্চিত কর্মসংস্থান ফ্রান্সের পাশাপাশি ইউরোপের অন্য দেশগুলোর তরুণদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি করছে।
এইচইসি প্যারিসের ইউরোপীয় ইউনিয়ন আইন ও নীতির অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নোর মতে, ফ্রান্সের আন্দোলনের সঙ্গে ইউরোপের অন্যান্য দেশের বিক্ষোভের বেশ কিছু মিল রয়েছে।
ইতালিতে ১৬ অক্টোবর ‘নো মেলোনি ডে’ কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা খাতে বাজেট কমানোর প্রতিবাদ জানান। শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশে সীমিত করার সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়েও ক্ষোভ দেখা দেয়। রোম ও তুরিনে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ করেন। ১৭ অক্টোবর মিলানে বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশের দিকে পাথর ছোড়ে এবং ব্যারিকেডে আগুন দেয়।
বেলজিয়ামেও শিক্ষা খাতে বাজেট ছাঁটাই ও অতিরিক্ত ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। লিয়েজ শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্টিন বিক্ষোভের সময় সহিংসতার নিন্দা জানান।
আলবেনিয়ায় দুর্নীতি, বেকারত্ব ও সরকারের প্রতি অসন্তোষকে কেন্দ্র করে আন্দোলন চলছে। প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবিতে ১৭ অক্টোবর রাজধানী তিরানায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে হাজারো তরুণ বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে।
এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থনে নেওয়া একটি বিলাসবহুল উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরেও আলবেনিয়ায় ক্ষোভ রয়েছে। আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করলেও এদি রামা পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বিরোধীরা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরিতে আন্দোলনকে ব্যবহার করছে।
স্পেন ও পর্তুগালে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এবং আয়ের তুলনায় আবাসন ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। গ্রিসে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বাড়তি অর্থায়নের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন। বিভিন্ন দেশে তরুণদের আন্দোলনে দুর্নীতিবিরোধী দাবি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও উঠে এসেছে।
২৭ বছর বয়সী সাশা কোসি, যিনি কনসার্টে সহকারী হিসেবে কাজ করেন, মাদ্রিদের কেন্দ্রে তাঁবু গেড়ে থাকা তরুণদের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘ভবিষ্যৎহীন প্রজন্মের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে।’
কোসি বলেন, স্বল্প বেতন, আকাশচুম্বী বাড়িভাড়া, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা তরুণদের হতাশা বাড়াচ্ছে। আগের প্রজন্মের মতো সামাজিক কল্যাণমূলক সুবিধা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও অনেকে উদ্বিগ্ন।
ইউরোপের জনসংখ্যা ক্রমে বয়স্ক হয়ে উঠছে। পেনশন ও অন্যান্য সামাজিক কর্মসূচির ব্যয় বাড়ায় সরকারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিবাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক বিভাজন বিভিন্ন দেশে নীতিনির্ধারণকে জটিল করে তুলছে।
তরুণদের অভিযোগ, সরকারি পরিষেবা ও সুযোগ-সুবিধা ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং তাদের উদ্বেগ যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। ইতালির বিক্ষোভকারী ও পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ২২ বছর বয়সী স্টেলা সালিস বলেন, তরুণদের মধ্যে প্রত্যাখ্যান ও ক্লান্তির অনুভূতি কাজ করছে।
বিভিন্ন দেশের বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ও স্লোগান ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বেলজিয়ামের তরুণদের অনুপ্রাণিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউরোপের চলমান অসন্তোষ ডানপন্থী ও চরম ডানপন্থী দলগুলোর সমর্থন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। তবে জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসনসংকট ও শিক্ষা খাতের সংকট নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সব মানুষ একই রাজনৈতিক অবস্থান ধারণ করেন—এমন নয়।
অভিবাসন ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনাস্থা ডানপন্থী দলগুলোর রাজনৈতিক বক্তব্যে গুরুত্ব পাচ্ছে। জাতীয় পরিচয় ও সংস্কৃতি রক্ষার দাবিও এসব দলের সমর্থন বৃদ্ধির আলোচনায় রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমের প্রচার অভিবাসনবিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী পপুলিস্ট দলগুলোর সমর্থন বাড়ার উদাহরণও রয়েছে। ২০২২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ইতালির নির্বাচনে জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন ব্রাদার্স অব ইতালি দল জয়ী হয়ে মধ্য-ডানপন্থী জোট সরকার গঠন করে। দলটিকে বিভিন্ন বিশ্লেষণে চরম ডানপন্থী হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
বেলজিয়ামের ফ্লেমিস ইন্টারেস্ট দলও অভিবাসন ও ইসলামবিরোধী বক্তব্যের জন্য আলোচনায় এসেছে। ফিনল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজনীতিতেও ডানপন্থী দলগুলোর প্রভাব নিয়ে আলোচনা চলছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাথিজ রুডুইজনের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভোটারদের একটি অংশ প্রচলিত রাজনৈতিক দলের বাইরে বিকল্প শক্তিকে সমর্থন দিচ্ছেন। প্রতিবেদনে উল্লেখিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩১টি দেশের জাতীয় নির্বাচনে মূলধারার রাজনৈতিক দলের বাইরে ভোট দেওয়া মানুষের হার বেড়েছে। এই পরিবর্তনের একটি অংশ চরম ডানপন্থী দলগুলোর সমর্থন বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।
জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসনসংকট, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ ইউরোপের রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। তবে এসব সমস্যার সমাধানে সরকারগুলোর নীতি ও পদক্ষেপই ভবিষ্যতে জনঅসন্তোষের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র : রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, ইন্ডিয়া টুডে ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।
Muktomon/TA