মুক্তমন রিপোর্ট : ঢাকা-গাজীপুর করিডরে যান চলাচল সহজ ও নির্বিঘ্ন করতে বিদ্যমান বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের অবকাঠামো পুনর্বিন্যাস করে সড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিআরটি স্টেশন, লেন বিভাজক ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো অপসারণের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যমান দুই লেনের দুটি উড়ালসড়ক চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জারি করা এক চিঠি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে রোববার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি বিলুপ্ত করে এর দায়িত্ব সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সড়কের উভয় পাশে সাধারণ যানবাহন চলাচলের জন্য তিনটি করে লেন থাকবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ১৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রাথমিক অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতির হালনাগাদ তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বাসসকে বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাঁরা অবগত হয়েছেন এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নেওয়া হচ্ছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রাথমিক অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
২০১২ সালের নভেম্বরে অনুমোদিত ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্পটি ২ হাজার ৩৭ দশমিক ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। তবে বিভিন্ন কারণে বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটে। কয়েক দফা সংশোধনের পর প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ দশমিক ৩২ কোটি টাকায়।
বাংলাদেশ সরকার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং ফ্রান্সের উন্নয়ন সংস্থা এজেন্স ফ্রঁসেজ দ্য দেভেলপমঁ (এএফডি) প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর নাগাদ অবকাঠামোগত কাজের প্রায় ৯৭ শতাংশ শেষ হলেও সার্বিক বাস্তব অগ্রগতি ছিল ৭৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ওই বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা আর বাড়ানো হয়নি।
পরবর্তী সময়ে বিআরটির জন্য নির্মিত পৃথক লেন সাধারণ যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। তবে বাস কেনার দুটি উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ায় পরিকল্পিত বিআরটি সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। একই সঙ্গে প্রকল্পের নকশা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সরকার চারটি বিকল্প বিবেচনা করে। এগুলো হলো—বিআরটি প্রকল্পের কাজ শেষ করা, রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিং পদ্ধতিতে বাস চালু করা, করিডরকে টোলভিত্তিক এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তর করা অথবা সাধারণ মহাসড়কে পরিণত করা। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের বিকল্পটি বেছে নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি পর্যালোচনা দলও প্রকল্পটির নকশাগত ত্রুটি ও সীমিত সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে বিআরটি সেবা চালুর পরিকল্পনা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। দলটি নতুন করে বিনিয়োগ না করে বিদ্যমান অবকাঠামো সাধারণ যানবাহন চলাচলে ব্যবহারের পরামর্শ দেয়।
এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরেও অন্তর্বর্তী সরকার অতিরিক্ত সময় ও অর্থের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে ঢাকা-গাজীপুর রুটে বিআরটি সেবা চালু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও নাগরিক সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এ সিদ্ধান্তকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণপরিবহন ব্যবস্থার জন্য নেতিবাচক উল্লেখ করে তা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে।
সংগঠনটির মতে, এ সিদ্ধান্ত গাজীপুর পরিবহন মহাপরিকল্পনা এবং ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের আশঙ্কা, এতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারকে প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে এবং গাজীপুর ও উত্তরার বাসিন্দাদের গণপরিবহনের চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ হবে না।
দীর্ঘদিনের বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি ও বাস্তবায়ন জটিলতার পর ঢাকা-গাজীপুর করিডরকে ছয় লেনের সাধারণ সড়কে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এখন বিদ্যমান অবকাঠামোর যথাযথ ব্যবহার, যানজট নিয়ন্ত্রণ, সড়ক নিরাপত্তা এবং গণপরিবহনের সুযোগ নিশ্চিত করাই এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
সূত্র : বাসস
Muktomon/TA