সরকারের সমালোচনা করুন, তবে অহেতুক প্রতিবন্ধকতা নয়: আবদুস সালাম

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারের ভুল-ত্রুটির সমালোচনা করা সাংবাদিকদের দায়িত্ব। তবে সমালোচনার পাশাপাশি সরকারের যাত্রাপথে অহেতুক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে দেশকে এগিয়ে নিতে ইতিবাচক পরামর্শ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কাকরাইলে আইডিবি ভবনে ‘দ্য ডেইলি বাংলাদেশ ডায়েরি’র পঞ্চম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

আবদুস সালাম বলেন, সাংবাদিকতা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংবাদপত্রকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। দেশের প্রতি, জনগণের প্রতি ও সমাজের প্রতি সাংবাদিকদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সমাজের অনিয়ম ও ত্রুটি তুলে ধরে সমালোচনার মাধ্যমে তাঁরা সমাজকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখেন।

পত্রিকাটির পঞ্চম বর্ষপূর্তিতে শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ডায়েরি’র সঙ্গে যুক্ত ড. আসাদুজ্জামান খান একজন কবি, গীতিকার ও গায়ক। একজন শিল্পীমনা মানুষ দেশকে সুন্দরভাবে দেখেন এবং সেভাবেই দেশকে সাজাতে চান। তাঁর মতো মানুষের সংবাদপত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠানটিকে আরও সমৃদ্ধ করে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে আবদুস সালাম বলেন, স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে দেশ পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। তবে গণতন্ত্র বিভিন্ন সময়ে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা নতুন করে শুরু হয়েছে। এ যাত্রা যাতে ব্যাহত না হয় এবং দেশ আবার গণতন্ত্রের পথ থেকে ছিটকে না পড়ে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

বর্তমান সরকারের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, সমস্যাসংকুল একটি দেশের দায়িত্ব নিয়েছে সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি, গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকট ছিল। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের সমস্যা এবং ব্যাংক খাতের সংকটও রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে তেলের দাম ও সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশও এর বাইরে নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এসব পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে। সব সমস্যার সমাধানে সময় প্রয়োজন।

আবদুস সালাম বলেন, দীর্ঘ সময় গ্যাসকূপ খনন করা হয়নি। এখন নতুন করে গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুতের দিকে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। বিদ্যুৎ খাতে অতীতে অনিয়ম ও দুর্নীতির যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো থেকে বেরিয়ে আসতেও সময় লাগবে।

সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে ইতিবাচক সমালোচনা করতে হবে। তবে সরকারের যাত্রাপথে অহেতুক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা উচিত নয়। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। কীভাবে সমস্যাগুলোর সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে সরকারকে ইতিবাচক পরামর্শ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে আবদুস সালাম বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় নগর ব্যবস্থাপনা অনেকটাই ভেঙে পড়েছিল। ব্যাটারিচালিত রিকশা, হকার ও জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। পুরান ঢাকার অনেক এলাকায় পরিকল্পিত উন্নয়ন হয়নি। অনেক ড্রেনও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের উপযোগিতা হারিয়েছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকা দক্ষিণ সিটিকে চারটি ভাগে ভাগ করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এক এলাকার রিকশা যাতে অন্য এলাকায় যেতে না পারে, সে ব্যবস্থা করার কথা বলেন তিনি। আশপাশের এলাকা থেকে রিকশার ঢাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রিকশাগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগের কথাও জানান। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

হকারদের বিষয়ে আবদুস সালাম বলেন, রাজপথ বা মানুষের চলাচলের জায়গায় হকার বসতে দেওয়া হবে না। তবে নির্দিষ্ট দিনে ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিছু সড়কে হকারদের বসার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের নিবন্ধনের আওতায় আনার কথাও জানান তিনি।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তিন মাসের কর্মসূচি শুধু সিটি করপোরেশনের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এ কাজে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বাড়ি, আঙিনা, ছাদ ও পাশের ড্রেন পরিষ্কার রাখতে হবে এবং কোথাও দীর্ঘ সময় পানি জমতে দেওয়া যাবে না।

ঢাকার পরিচ্ছন্নতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সকাল ছয়টা থেকে আটটা পর্যন্ত শহরের অনেক জায়গায় ময়লা দেখা যায় না। কিন্তু মানুষ রাস্তায় বের হওয়ার পর ধীরে ধীরে সেখানে আবর্জনা জমে। নাগরিকেরা সচেতন হয়ে রাস্তায় টিস্যু, বোতলসহ বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা না ফেললে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।

পরিবেশ রক্ষায় গাছ লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আবদুস সালাম বলেন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কার্বন ডাই-অক্সাইডের ক্ষতি কমানো ও অক্সিজেনের ভারসাম্য রক্ষায় গাছ লাগানোর বিকল্প নেই।

সাংবাদিক, সম্পাদক ও সংবাদপত্রের মালিকদের জনগণকে সচেতন করার দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সবাই মিলে কাজ করলে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে এবং ঢাকা একটি পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগরীতে পরিণত হবে।

Muktomon/TA