জাকির কিবরিয়া :
পানি প্রথমে আসে নিঃশব্দে। তারপর হঠাৎ তার গতি বদলে যায়—শান্ত স্রোত রূপ নেয় প্রবল গর্জনে। নেপালে সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনাও যেন সেই বাস্তবতারই নির্মম প্রকাশ।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক ভিডিও চোখে পড়ছিল। কোথাও সড়ক পানির নিচে, কোথাও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত, কোথাও প্রবল স্রোতে মানুষজন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করছে।
ভিডিওগুলোর নিচে মানুষের আরেকটি প্রশ্নও চোখে পড়ছিল—এসব কি সত্যি, নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি?
এটাই আমাদের সময়ের নতুন বাস্তবতা। এত বেশি কৃত্রিম ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে যে সত্যিকেও এখন অবিশ্বাস করতে হয়।
কয়েক সপ্তাহ আগেও হিমালয়ের বরফ নিয়ে লিখেছিলাম। এভারেস্টের কাছে খুম্বু আইসফলের সেই নীলচে বরফ, নীরব তুষারভূমি আর প্রাচীন হিমবাহের কথা মনে পড়ছিল। এবার সেই বরফই যেন অন্য ভাষায় উত্তর দিয়েছে—গলন, কাদা, পানি ও পাহাড়ধসের ভাষায়।
তৃতীয় মেরুর বিপদ
হিন্দুকুশ হিমালয়কে বলা হয় ‘তৃতীয় মেরু’। মেরু অঞ্চল দুটির বাইরে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বরফভাণ্ডার রয়েছে এই পর্বতমালায়। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, এই অঞ্চলের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে।
বিজ্ঞানভিত্তিক এসব সতর্কতা অনেক সময় আমাদের কাছে দূরের কোনো বিষয় বলে মনে হয়। কিন্তু নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগ সেই সতর্কতাকে বাস্তবতার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
একটি হিমবাহ থেকে গলে পড়া সামান্য পানি একসময় আরও পানির সঙ্গে মিশে বড় জলাধার তৈরি করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সেই পানি বরফ, পাথর ও মাটির প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে আটকে থাকে। কোনো একসময় অতিরিক্ত পানি, ভূমিধস, তুষারধস কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক কারণে সেই বাঁধ ভেঙে গেলে নেমে আসতে পারে ভয়াবহ জলস্রোত।
এ ধরনের ঘটনাকে বলা হয় গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (GLOF) বা হিমবাহ-উৎসারিত হ্রদের আকস্মিক প্লাবন।
নেপালসহ হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের ঝুঁকি নতুন নয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং পাহাড়ি পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তন এই ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নদী কোনো সীমান্ত মানে না।
তিব্বত মালভূমি থেকে নেমে আসা পানি নেপালের পাহাড়ি নদী হয়ে আরও নিচের দিকে যায়। পরে সেই পানি ভারতের সমতলভূমি পেরিয়ে বাংলাদেশের বদ্বীপে পৌঁছায়। নদীর স্রোত তার পথে কোনো পাসপোর্ট পরীক্ষা করে না, কোনো রাজনৈতিক সীমারেখার সামনে থেমে যায় না।
মানুষ মানচিত্রে সীমান্ত টেনেছে। পানি কখনো তা মানেনি।
একই পানির সঙ্গে যুক্ত আমাদের জীবন
নেপালের পাহাড়ি জনপদ কিংবা বাংলাদেশের বরিশালের নদীতীর—দুই জায়গার মানুষের জীবন আলাদা মনে হতে পারে। তাঁদের ভাষা, রাষ্ট্র, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জীবনযাপন ভিন্ন।
কিন্তু তাঁদের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আকাশ একই। আর পানির চক্রও একই।
হিমালয়ে যে বরফ গলে, তার একটি অংশ নদীর সঙ্গে নিচে নামে। সেই নদী বহু পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত সাগরে মেশে। এই বিশাল জলচক্রের কোথাও একটি দেশের সীমান্ত নেই।
আমরা শত শত বছর ধরে মানচিত্রে রেখা টেনেছি, রাষ্ট্র তৈরি করেছি, নিজেদের আলাদা পরিচয়ে ভাগ করেছি। কিন্তু প্রকৃতি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—আমরা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।
পানি সেই সংযোগের সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণগুলোর একটি।
সত্য দেখেও যখন সন্দেহ হয়
নেপালের বন্যার ভিডিওগুলো দেখতে দেখতে আরেকটি বিষয় মনে হয়—আমরা কি এখন বাস্তবতাকেও বিশ্বাস করতে ভুলে যাচ্ছি?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি, ভিডিও ও ভুয়া তথ্য এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে যে বাস্তব কোনো দৃশ্যও অনেক সময় অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়।
কিন্তু প্রকৃতি এখনও এমন কিছু ঘটাতে পারে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি দৃশ্যের মতোই অবিশ্বাস্য মনে হয়।
নদীর পানি সত্যিই বাড়ে। পাহাড় সত্যিই ধসে পড়ে। মানুষের বসতি সত্যিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এসব বাস্তবতার অস্তিত্ব নির্ভর করে না আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ভিডিওটি বিশ্বাস করছি কি না তার ওপর।
দূরের দুর্যোগ নয়
দুর্যোগের ছবি ফোনের পর্দায় দেখা সহজ। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে আমরা আবার অন্য পোস্টে চলে যেতে পারি। নিজের ঘরে বসে নিরাপদ অবস্থায় অন্য মানুষের বিপর্যয় দেখা আমাদের সময়ের এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।
কিন্তু সেই পর্দার ওপারে থাকা মানুষগুলোর জন্য এটি কোনো ভিডিও নয়। এটি তাঁদের জীবন।
তাই এমন দুর্যোগের সময় শুধু ছবি দেখা বা খবর পড়াই যথেষ্ট নয়। আমাদের বুঝতে হবে, হিমালয় থেকে বাংলাদেশের বদ্বীপ পর্যন্ত একটি বিশাল পরিবেশগত ব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
একটি অঞ্চলের পরিবর্তন অন্য অঞ্চলের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
একটি হিমবাহের গলন, একটি নদীর প্রবাহের পরিবর্তন কিংবা পাহাড়ি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সবকিছুর প্রভাব কোনো না কোনোভাবে বৃহত্তর জলব্যবস্থায় পৌঁছাতে পারে।
পানি আমাদের সবচেয়ে বড় সংযোগ
একটি শিশু বাংলাদেশের বৃষ্টির পানি হাতে নেয়। নেপালের পাহাড়ে কোনো মানুষ নদীর পানির পরিবর্তন দেখে উদ্বিগ্ন হন। তিব্বতের হিমবাহ থেকে বরফ গলে নিচের দিকে পানি নামে।
তিনটি দৃশ্য আলাদা। কিন্তু তাদের মধ্যে একটি অদৃশ্য যোগসূত্র রয়েছে—পানি।
আমরা সবাই কোনো না কোনো নদীর ভাটিতে বাস করি। কারও ভাটি পাহাড়ের কাছে, কারও সমতলে, কারও সমুদ্রের কাছাকাছি।
তাই নেপালের দুর্যোগ শুধু নেপালের বিষয় নয়। হিমালয়ের পরিবর্তন শুধু হিমালয়ের মানুষের বিষয় নয়। জলবায়ু ও পানির এই আন্তঃসম্পর্ক আমাদের সবাইকে একই গল্পের অংশ করে তুলেছে।
মানচিত্র আমাদের আলাদা করে। পানি আমাদের এক করে।
হিমালয় থেকে যে পানি নেমে আসে, তার শেষ গন্তব্য সমুদ্র। সেই দীর্ঘ যাত্রাপথে আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে তার সঙ্গে যুক্ত।
এখন আমরা সবাই ভাটির মানুষ।
লেখক : জাকির কিবরিয়া একজন বাংলাদেশী লেখক, নীতি বিশ্লেষক এবং উদ্যোক্তা। তিনি কাঠমান্ডুতে বসবাস করেন।
ইমেইল: [email protected]