উত্তরার মনসুর আলী মেডিকেলে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১২; গেট ভেঙে ঢোকার অভিযোগ

উত্তরার মনসুর আলী মেডিকেলে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১২; গেট ভেঙে ঢোকার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : আদালতে বিচারাধীন একটি বিষয় নিষ্পত্তির আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি চিঠিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর উত্তরা শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। নতুন গভর্নিং বডির দায়িত্ব গ্রহণকে কেন্দ্র করে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) নেতাকর্মীদের সঙ্গে হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীদের ধাক্কাধাক্কি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুর ২টার দিকে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ১০/বি রোডের ২৬ ও ২৬/এ নম্বর প্লটে অবস্থিত শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বিএনপির পেশাজীবী সংগঠন ড্যাবের নেতৃত্বে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন নেতাকর্মী দুপুরে হাসপাতাল এলাকায় জড়ো হন। নতুন গভর্নিং বডির দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়কে কেন্দ্র করে একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীদের কথা-কাটাকাটি ও ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, সংঘর্ষের একপর্যায়ে হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়। পরে ড্যাবের সঙ্গে থাকা ৭০ থেকে ৮০ জন নেতাকর্মী হাসপাতালের মূল ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে একটি স্মারকলিপি দেন বলে জানা গেছে।

ঘটনার সময় হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

চিঠিকে কেন্দ্র করে নতুন উত্তেজনা

এর আগে গত ৪ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি চিঠির অনুলিপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে পড়ার পর একদল তরুণ হাসপাতালের অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করে তাকে পদত্যাগের জন্য চাপ দেন বলে অভিযোগ ওঠে।

জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কলেজ পরিদর্শক এ কে এম আমজাদ হোসেন স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল প্র্যাকটিশনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মো. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাসকে গভর্নিং বডির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়নের কথা জানানো হয়।

চিঠিতে বলা হয়, গভর্নিং বডি-সংক্রান্ত হাইকোর্ট বিভাগের স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আপিল বিভাগে ‘লিভ টু আপিল’ দায়ের করলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তা স্থগিত করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নতুন গভর্নিং বডি পুনর্গঠন করে।

তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দাবি, গভর্নিং বডির বৈধতা নিয়ে আইনি বিষয় এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে আদালতের বিষয় নিষ্পত্তির আগেই নতুন গভর্নিং বডির দায়িত্ব গ্রহণের চেষ্টা নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

২০২৪ সালেও দখল নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নিয়ে দখল ও নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরেও মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটি দুই দফা দখলের অভিযোগ সামনে এসেছিল।

সে সময় আওয়ামী লীগ সমর্থিত চিকিৎসক সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি ডা. জামাল উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে বহিরাগতদের নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রবেশ করে নিজেকে ট্রাস্টের সেক্রেটারি দাবি করার অভিযোগ ওঠে।

এরপর সরকার পরিবর্তনের পর ড্যাব সমর্থিত ডা. মো. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও প্রতিষ্ঠানটি দখলের অভিযোগ আনে শহীদ মনসুর আলী ট্রাস্ট। ট্রাস্টের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ আইন-২০২২-এর বিধান অনুসরণ না করে তাকে গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান মনোনীত করা হয়েছিল।

ওই সময় বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে রিটও করা হয় এবং আদালত রুল জারি করেন বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে জানা যায়।

তবে ডা. মো. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাস তখন দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার পর তিনি প্রতিষ্ঠানে গিয়েছেন। তার দাবি ছিল, তিনি কোনো বেআইনি দখল করেননি।

ট্রাস্টের অভিযোগ বনাম ড্যাব সমর্থিত পক্ষের বক্তব্য

২০২৪ সালে শহীদ মনসুর আলী ট্রাস্টের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছিল, দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক ও আর্থিক অবস্থার উন্নতি করা হয়েছে এবং ২০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পরিশোধের পর প্রতিষ্ঠানের সঞ্চয় ২৬ কোটি টাকার বেশি হয়েছিল।

অন্যদিকে ডা. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাস এসব অভিযোগের বিষয়ে বলেছিলেন, তিনি বেআইনিভাবে প্রতিষ্ঠান দখল করেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার পরই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।

অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছিলেন।

পুলিশের অবস্থান

এদিকে বুধবারের ঘটনার বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানা-পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, সংঘর্ষের সময় হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে উত্তেজনা তৈরি হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের গভর্নিং বডির বৈধতা, দায়িত্ব হস্তান্তর এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিরোধ নতুন করে সংঘর্ষে গড়ানোয় শিক্ষক, চিকিৎসক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি যেহেতু আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত, তাই আদালতের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো পক্ষ যেন জোরপূর্বক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা না করে—এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।