মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি : মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেছেন, সারাদেশে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত সম্মুখ সমরের স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ বা উপযুক্ত স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ লিপিবদ্ধ ও নথিভুক্ত করা হবে।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার রাজানগর সৈয়দপুর ইউনিয়নের ফুলহার গ্রামে ধলেশ্বরী নদীর তীরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের একটি সম্মুখ সমরের স্থান পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, “এখানে এসে আমরা যুদ্ধের স্থানটি পরিদর্শন করেছি। আমাদের সঙ্গে কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং তৎকালীন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরাও ছিলেন। তাঁদের কাছ থেকে সে সময়ের ঘটনাবলি ও যুদ্ধের বিস্তারিত ইতিহাস শুনেছি।”
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সারাদেশের যেসব স্থানে সম্মুখ সমর সংঘটিত হয়েছিল, সেসব স্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে পরিকল্পনা নেওয়া হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ বা অন্য কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য নথিভুক্ত করা হবে।
ইশরাক হোসেন বলেন, সৈয়দপুর এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনটি সম্মুখ সমর সংঘটিত হয়েছিল বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে। এর মধ্যে একটি স্থান তিনি পরিদর্শন করেছেন। পরবর্তী সময়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ওই যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা এবং স্মৃতি সংরক্ষণে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে দেশ নানা চড়াই-উতরাই ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ২০২৪ সালের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানও ঘটেছে। আমার বিশ্বাস, এসব সংগ্রাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে।”
তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে নানা আধিপত্যবাদী শক্তি বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে। এর বিরুদ্ধে দেশের জনগণ বারবার প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তবে জাতির এই প্রতিরোধ ও মুক্তির সংগ্রামের মূল সূচনা হয়েছিল ১৯৭১ সালে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনী যুদ্ধ করেছে। এতে বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন এবং অনেক বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এসব ঐতিহাসিক ঘটনা ও স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরি।
তিনি বলেন, “আমরা এমন উদ্যোগ নেব, যাতে বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, তত দিন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষিত ও সমুন্নত থাকে। কোনো জাতি যদি নিজের ইতিহাস জানতে না পারে কিংবা তা ধারণ করতে না পারে, তাহলে তারা কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না।”
সৈয়দপুর এলাকাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইশরাক হোসেন বলেন, তিনি এখন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিমন্ত্রী এবং সারা দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করছেন। তাই কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, এর আগে তিনি নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা পরিদর্শন করেছেন এবং মুন্সিগঞ্জের অন্য এলাকাও ঘুরে দেখেছেন। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো পক্ষপাতিত্ব করা হবে না।
তবে সৈয়দপুরের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক ও আবেগের সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তাঁর জন্ম ঢাকায় হলেও পূর্বপুরুষের সূত্রে এই এলাকার সঙ্গে তাঁর নাড়ির সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি বলেন, তাঁর বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। পারিবারিকভাবে তিনি জেনেছেন, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে তাঁর বাবা ধলেশ্বরী নদী সাঁতরে পার হয়েছিলেন। এ কারণে এলাকাটির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
ইশরাক হোসেন বলেন, “এই ইতিহাস আমার জন্য ব্যক্তিগতভাবে আবেগের বিষয়। তবে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আমি সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষণে কাজ করে যাব।”