মুক্তমন রিপোর্টার : নড়াইলের কালিয়াবাসীর দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে প্রায় আট বছর পর নবগঙ্গা নদীর ওপর নির্মাণাধীন কালিয়া সেতুর কাজ শেষ পর্যায়ে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সেপ্টেম্বরে সেতুটি উদ্বোধন করে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই সেতু চালু হলে নবগঙ্গা নদীর কারণে বিচ্ছিন্ন কালিয়া উপজেলা সদরসহ দুই শতাধিক গ্রামের মানুষের সঙ্গে নড়াইল জেলা সদর এবং দেশের বিভিন্ন এলাকার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ তৈরি হবে। এতে কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ এলাকার আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পূর্ণাঙ্গ অবয়ব পেয়েছে কালিয়াবাসীর স্বপ্নের সেতুটি। সেতুর মাঝ বরাবর স্থাপন করা ধনুকাকৃতির আর্চ স্প্যান সেতুটিকে দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে। অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করতে সেতুর ওপর চলছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ।
বর্তমানে সেতুর মাঝের ৮৫ দশমিক ২১ মিটার ডেক স্ল্যাব ঢালাইয়ের প্রস্তুতি চলছে। শ্রমিকরা রড বাঁধাইসহ প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করতে দিন-রাত কাজ করছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে আশাবাদী তারা।
নবগঙ্গা নদীর পূর্বপাড়ে অবস্থিত কালিয়া উপজেলার দুই লক্ষাধিক মানুষের জেলা সদরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত সহজ করতে নদীর ওপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় নড়াইল সড়ক বিভাগ।
প্রথম পর্যায়ে ১৫ স্প্যানের ৬৫১ দশমিক ৮৩ মিটার দীর্ঘ এবং ৭ দশমিক ৩ মিটার প্রশস্ত সেতুটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭২ কোটি টাকা। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে জামিল ইকবাল ও মো. মঈনুদ্দিনের যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০১৭ সালের ১ জুলাই কার্যাদেশ পায়।
কাজ শুরুর পর সেতুর নকশায় ত্রুটি ধরা পড়ায় নির্মাণকাজে জটিলতা দেখা দেয়। পরে নকশা সংশোধন করে ২০১৮ সালের ১৮ মার্চ একই প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী ২০২০ সালের ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার পাশাপাশি করোনাভাইরাস মহামারির কারণে প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়।
এর মধ্যে নবগঙ্গা নদীতে চলাচলকারী বালুবাহী বাল্কহেডের ধাক্কায় নির্মাণাধীন সেতুর ৯ নম্বর পিলার ভেঙে পড়ে। এতে সেতু নির্মাণের কাজ দীর্ঘ সময়ের জন্য থেমে যায়। নতুন করে নকশা প্রণয়ন ও ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছিল না।
পরবর্তীতে সেতুর মাঝখানে ১৭৩ দশমিক ৬৬ মিটার গ্যাপ রেখে ৯ নম্বর পিলার বাদ দেওয়া হয়। গ্যাপের দুই পাশে ১২টি পিলার এবং ১৫টির মধ্যে ১১টি স্প্যান স্থাপনের পর ২০২৩ সালে প্রথম পর্যায়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পাওনা পরিশোধ করে কাজ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
পরে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ নকশা প্রণয়ন ও ব্যয় বৃদ্ধি করে সেতুর মাঝের অংশে চারটি স্প্যানের পরিবর্তে তিনটি আর্চ নেটওয়ার্ক স্টিল স্প্যান সংযোজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ কাজ সম্পন্ন করতে ২০২৪ সালের ১২ মে কনক্রিট অ্যান্ড স্টিল টেকনোলজিকে দ্বিতীয় ধাপে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
এরপর দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে নির্মাণকাজে গতি আসে। এতে সেতুটির মোট নির্মাণ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৪ কোটি টাকা।
কনক্রিট অ্যান্ড স্টিল টেকনোলজির প্রজেক্ট ম্যানেজার প্রকৌশলী আব্দুল ওয়াদুদ খান লিটন বলেন, সেতুর প্রায় ৯৮ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। মাঝের ১৭৩ দশমিক ৬৬ মিটার গ্যাপের জন্য নির্মিত তিনটি আর্চ নেটওয়ার্ক স্টিল স্প্যানের মধ্যে মাঝের ৮৫ দশমিক ২১ মিটার দীর্ঘ স্প্যানটি স্থাপন করা হয়েছে। এখন ওই অংশের ডেক স্ল্যাব ঢালাইয়ের প্রস্তুতি চলছে।
তিনি জানান, অবশিষ্ট কাজের মধ্যে ডেক স্ল্যাব ঢালাই সবচেয়ে বড় কাজ। দুই পাশে ৪২ দশমিক ৪১৫ মিটার দীর্ঘ দুটি স্টিল আর্চ স্প্যান স্থাপনের কাজও শেষ পর্যায়ে। এসব অংশের ডেক স্ল্যাবের ঢালাই ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ৫০ মিটার সংযোগ সড়কের কাজও এক-দুই দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক আরও জানান, ডেক স্ল্যাবের কাজ শেষ হওয়ার পর প্যারাপেট ওয়াল নির্মাণ, রং ও লাইটিংয়ের কাজ করা হবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সেতুটি হস্তান্তর করা সম্ভব হবে।
নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দীর্ঘদিনের জটিলতার কারণে কালিয়া সেতুর নির্মাণকাজে বিলম্ব হয়েছে এবং এতে কালিয়াবাসীকে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বর্তমান সরকারের উদ্যোগে সেতুটির কাজ দ্রুত শেষ হচ্ছে।
তিনি বলেন, সেতুটি চালু হলে এ অঞ্চলের কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি কালিয়াবাসীর দীর্ঘদিনের যোগাযোগের দুর্ভোগও অনেকটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।